ডেস্ক রিপোর্টার,২রা জুলাই।।
২৩ এর বিধানসভা নির্বাচনে বাম – কংগ্রেসের আঁতাত নিয়ে শোরগোল রাজ্য রাজনীতিতে। শাসক দল বিজেপিকে আটকাতে হাতে হাত মিলিয়ে ভোট ময়দানে লড়াই করতে চাইছে বাম – কংগ্রেস। রাজ্যের কমিউনিস্ট ও কংগ্রেসের কাছে এই মুহূর্তে আদর্শ হয়ে উঠেছে “বাংলা মডেল” । পশ্চিমবাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করতে পর পর দুইটি বিধানসভা নির্বাচনে বাম- কংগ্রেস এক আত্মা হয়ে উঠেছিল। যদিও তারা সফলতা পায়নি। বাংলার শেষ বিধানসভা নির্বাচনে বাম- কংগ্রেসের জোটকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল বিজেপি। ত্রিপুরাতে ভোটর বাইশ গজে বাম- কংগ্রেস জোট কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবে তা অবশ্যই বলবে সময়েই। তবে জল যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে স্পস্ট রাজ্য রাজনীতিতে অদূর ভবিষ্যতে বাম – কংগ্রেস একই মঞ্চে আসতে চলছে।
সম্প্রতি কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিজেপির সন্ত্রাস ঠেকাতে সমস্ত বিরোধীদের নিয়ে বৈঠক করবেন তিনি। অর্থাৎ ঘুরিয়ে বললে, বৃহত্তর বিরোধী মঞ্চের ঘোষণায় দিয়েছিলেন সুদীপ রায় বর্মন। তাতে অবশ্যই আপত্তি নেই মেলারমাঠেরও। রাজ্য সিপিএমের সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরীও সম্প্রতি সুদীপের সুরে কথা বলেছেন। পিছিয়ে নেই সিপিএমের পলিটব্যুরোর সদস্য তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। তিনিও বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, “ওরা চাইলে জোট হবে”। ওরা বলতে মানিক সরকার কংগ্রেসকেই বুঝিয়েছেন তা নিশ্চিত।
উপভোটের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যে এসেছিলেন লোকসভায় কংগ্রেসের পরিষদীয় দলনেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী তিনিও বাম কংগ্রেস জোটের পক্ষেই সিলমোহর দিয়েছিলেন। অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের হাই কমান্ডের চিন্তাভাবনাও প্রকট হয়ে উঠেছে অর্থাৎ বিজেপিকে আটকাতে রাজ্য রাজনীতিতে কংগ্রেস সিপিএমের নতুন রসায়ন দেখা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
২৩-র বিধানসভা নির্বাচনে বাম- কংগ্রেস জোট হলে ত্রিপুরাতে কি ঘটবে “ক্ষমতার বদল”? নাকি “ফ্লপ” হবে জোট রাজনীতি। তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। “সদ্য সমাপ্ত চার কেন্দ্রের উপনির্বাচনে ফলাফল বিশ্লেষণ করলে জোট রাজনীতি কিন্তু অংকের হিসেব পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট,” বলছেন রাজনৈতিকরা।

* আগরতলা বিধানসভা কেন্দ্র
_____________________________
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত উপভোটে আগরতলা বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী সুদীপ রায় বর্মন জয়ী হয়েছেন। তার প্রাপ্ত ভোট ১৭ হাজার ৪৩১। সিপিএম প্রার্থী কৃষ্ণা মজুমদার পেয়েছেন ৬৮০৮ ভোট।এই কেন্দ্রে কংগ্রেস- সিপিআইএমের মোট ভোট সংখ্যা (১৭,৪৩১+৬,৮০৮)=২৩,২৩৯। এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ড: অশোক সিনহা পেয়েছেন ১৪,২৬৮ ভোট। তাহলে কংগ্রেস – সিপিআইএমের ভোটের সঙ্গে বিজেপির ভোটের ব্যধান (২৪,২৩৯ – ১৪,২৬৮)=৯,৯৭১ ভোট। তাহলে বাম – কংগ্রেস জোট হলে এবং যদি মানুষ এই জোটকে সমর্থন করে তাহলে কি হতে পারে চিত্র? তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

* বড়দোয়ালী বিধানসভা কেন্দ্র
______________________________
বড়দোয়ালী কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী তথা মুখ্যমন্ত্রী ডা:মানিক সাহা। মুখ্যমন্ত্রীর প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ১৭,১৮১। এই কেন্দ্রে দ্বিতীয় হয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থী আশীষ কুমার সাহা।তিনি ভোট পেয়েছিলেন ১১, ০৭৭টি ভোট।টাউন বড়দোয়ালীতে বাম প্রার্থী(ফরোয়ার্ড ব্লক) রঘুনাথ সরকার পেয়েছেন ৩,৩৭৬ ভোট।এই কেন্দ্রে কংগ্রেস ও বামের মোট ভোট (১১,০৭৭+৩৩,৭৬)=১৪,৪৫৩। বিজেপির ভোটের সঙ্গে কংগ্রেস – সিপিআইএমের মিলিত ভোটের ব্যবধান (১৭,১৮১- ১৪,৪৫৩)=২,৭২৮ ভোট। এই কেন্দ্রে বিরোধীরা দেদার ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ তুলেছিলো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জোট রাজনীতির ভোটের গতি প্রকৃতির চরিত্র স্পষ্ট।

* সুরমা বিধানসভা কেন্দ্র
________________________
সুরমা কেন্দ্রে লড়াইয়ের মূল অলিন্দে ছিল তিন দল। বিজেপি, তিপ্রামথা ও সিপিআইএম। এই কেন্দ্রে নিশ্চিতভাবে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী স্বপ্না দাস পাল। বিজেপির প্রার্থীর মোট ভোট ১৬,৬৭৭। সুরমাতে দ্বিতীয় স্থানে তিপ্রামথার প্রার্থী বাবুলাল সাতনামী। তাঁর ভোট সংখ্যা ১২,০৯৪।তৃতীয় স্থানে থাকা সিপিআইএম প্রার্থী অঞ্জন দাস পেয়েছেন ৮৪১৫ ভোট। এই আসনে কংগ্রেস প্রার্থী দেয় নি। তারা অঘোষিত ভাবে তিপ্রামথাকে সমর্থন করেছে। এই কেন্দ্রে দুই বিরোধী তিপ্রামথা ও সিপিআইএমের মোট প্রাপ্ত ভোট(১২,০৯৪+৮,৪১৫)=২০,৪৭৯। বিরোধীদের মোট ভোটের সঙ্গে বিজেপির ভোটের ব্যবধান(২০,৪৭৯ – ১৬,৬৭৭)=৩, ৮০২ভোট। নির্বাচনে বিরোধী শক্তি জোট হলে সম্ভাব্য চিত্র কি হতে পারে?

* যুবরাজ নগর কেন্দ্র
_______________________
উত্তর জেলার যুবরাজনগর কেন্দ্রটি উপভোটে বামেদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় বিজেপি এই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী মলিনা দেবনাথ। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১৮,৭৬৯।এই কেন্দ্রে দ্বিতীয় হয়েছেন সিপিআইএম প্রার্থী শৈলেন্দ্র নাথ।তিনি পেয়েছেন ১৪,১৯৭ভোট।তৃতীয় স্থানে থাকা কংগ্রেস প্রার্থী পেয়েছেন ১৪৪০ভোট। কংগ্রেস ও সিপিআইএমের ভোট ভোট সংখ্যা (১৪,১৯৭+১৪৪০)=১৫৬৩৪। বিজেপির প্রার্থীর সঙ্গে কংগ্রেস ও সিপিআইএমের মোট ভোটের ব্যবধান (১৮,৭৬৯ – ১৫,৬৩৪)=৩,১৩৫। যুবরাজ নগরে কংগ্রেসের হেভিওয়েট কোনো নেতা প্রচারে যান নি।বামেদের ক্ষেত্রেও তাই। শুধুমাত্র দলের রাজ্য সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী একটি সভা করেছিলেন।এই কেন্দ্রে কংগ্রেস – সিপিআইএমের জোর দিলে তাদের ভোট সংখ্যা আরো বাড়তে পারতো,বলেও মনে করছেন রাজনীতিকরা। মাত্র ৩,১৩৫ভোটের ব্যবধান বিজেপির জন্য কখনো নিরাপদ নয়।তাই জোট রাজনীতি চাঙ্গা হলে হিসেব আরো কঠিন হয়ে উঠবে বলেই মনে করছে ভোট বিশারদরা।
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রয়াত হয়েছিলেন বিধায়ক দিলীপ সরকার। এরপর এই কেন্দ্রে উপভোট অনুষ্ঠিত হয়।এই উপভোটে জয় পেয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী মিমি মজুমদার।কিন্তু তখনও দেখা গেছে বিজেপির ভোট থেকে বাম,কংগ্রেসের মিলিত ভোট অনেক বেশি।
এটাও বাস্তব,কংগ্রেস – সিপিআইএম জোট করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলেও বিজেপি সহজেই জমি ছেড়ে দেবে না। তাছাড়া চার কেন্দ্রের উপ নির্বাচনে বিজেপিকে অনেক বেশি চনমনে মনে হয়েছে। দলের ভুল ত্রুটি সারানোর কাজ করছে নেতৃত্ব। কংগ্রেস – সিপিআইএমের সম্ভাব্য জোট নিয়ে ইতিমধ্যেই মানুষের মনে তৈরি হয়েছে খটকা। তাদেরও চোখের সামনে ভেসে উঠেছে বাংলা মডেলের ব্যর্থতাও।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিজেপিকে আটকানোর জন্য কংগ্রেস – সিপিআইএমের জোটের বার্তা সাধারণ মানুষ কিভাবে নেবে সেইটাই এখন দেখার বিষয়। কেননা এই রাজ্যে দুই দফায় বামেরা ক্ষমতায় ছিল ৩৫ বছর। মাঝখানে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রেস টিইউজেএস জোট। বরাবরই রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে কংগ্রেস ও সিপিএম ছিল একে অপরের পরম শত্রু। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন কংগ্রেস- সিপিএমের গোপন সমঝোতার মাধ্যমেই দীর্ঘসময় রাজ্যে রাজনীতির মৌসূরী পাট্টা সাজিয়ে বসেছিল ।এই কারণেই নাকি বারবার কংগ্রেস নেতৃত্বকে উপঢৌকন দিয়ে ক্ষমতায় অলিন্দে টিকে থাকতো বামেরা। মানুষ বাম- কংগ্রেসের রাজনীতির উপর ভরসা না রাখতে পেরেই
শেষ পর্যন্ত ১৮-র বিধানসভা নির্বাচনে বিকল্পের খোঁজ পেয়ে যায়। এবং মানুষ বামেদের ক্ষমতাচ্যুত করে । এই পরিস্থিতিতে মানুষ কি আদৌ বাম- কংগ্রেস জোটের দিকে ঝুকবে? নাকি তারা থেকে যাবে গেরুয়া শিবিরের দিকেই।এই কোটি টাকার প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই জানতে অপেক্ষা করতে হবে ২৩র নির্বাচন পর্যন্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published.