ডেস্ক রিপোর্টার,১০ জানুয়ারি।।

১৯৯৩ থেকে ২০১৩।
টানা কুড়ি বছর রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় ছিলো ‘স্বপ্নে’র বাম সরকার।বাম শাসনে প্রশাসনের চোখের সামনে পর্দা টাঙিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আমদানি হয়েছিলো “নিগোসিয়েশন সংস্কৃতি”।শহর দক্ষিণের ওএনজিসি থেকে উত্তরের ঊষা বাজারের সিপিডব্লু অফিস। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র বটতলার জল সম্পদ অফিস থেকে আগরতলা পুর নিগম, নেতাজী চৌমুহনী থেকে গুরখাবস্তি হাউসিং বোর্ড, এফসিআই থেকে বনিক্য চৌমুহনী নেপকো ছিলো নিগোসিয়েশন বাণিজ্যের মৃগয়া ক্ষেত্র।পিছিয়ে ছিলো না মহকুমার বিভিন্ন সরকারি দাপ্তরগুলি।শহর থেকে জেলা-মহকুমার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর গুলিতে গড়ে উঠেছিল নিগোসিয়েশন কারবারের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।
নিগোসিয়েশন কারবারের মূল চাবিকাঠি থাকতো বাম রাজনীতির গডফাদারদের হাতে।পর্দার আড়ালে থাকা রাজনীতির প্রভুর বাকলমে ছিলো নিগোসিয়েশন কারবারের দন্ডমুন্ডের কর্তা। নি গোসিয়েশন কারবার থেকে অল্প সময়ে বেশি উপার্জনের বীজমন্ত্র দিয়ে যুব সমাজের মগজ ধোলাই করতেন বাম রাজনীতির বিধাতার।তাদের আঙ্গুলি নির্দেশে বিভিন্ন নি গোসিয়েশন গ্রুপের বস মনোনীত করা হতো। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মনোনীত বসদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো চিরতরে। আবার নি গোসিয়েশন বাণিজ্য পরিচশলনার জন্য নেতারা জন্ম দিতো নতুন দাদার। মাথার উপর রাজনীতির বিধাতার হাত থাকায় দাদার যখন তখন জড়িয়ে যেতো নানান অপরাধ মূলক কার্যকলাপে।


নিগোসিয়েশন কারবারী থেকে হয়ে উঠতো পুরোদুস্তর মাফিয়া। তখন এই সমস্ত দাদাদের তেজস্ক্রিয়তার ঝলসে যেতো অরক্ষা প্রশাসনের তাবড় তাবড় আধিকারিকরা। এই ভাবে সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করে অজ পাড়ার নিরীহ ছেলে হয়ে উঠতো অপরাধ জগতের বেতাজ বাদশা।
৯৩-২০১৩ এই কুড়ি বছরে নি গোসিয়েশন বাণিজ্যের এক চেটিয়া দখল নিতে একে অপরের সঙ্গে গ্যাং ওয়ারে লিপ্ত হয়েছিলো বিভিন্ন মাফিয়া গোষ্ঠি। প্রতিটি গ্যাং ওয়ারের পেছনে ছিলো মুখোশধারী বাম রাজনেতাদের পাশাঘুঁটির চাল। যে নিগোসিয়েশন গোষ্ঠি বেশি ‘বখরা’ দিতে পারতো তাদের মাথায় থাকতো বাম নেতাদের বিশ্বস্ত হাত।
এই সময়ে বাম জামানায় গ্যাংওয়ারের প্রথম বলি সিপিআইএম’র ছাত্র নেতা সেলিম মিয়া। বাধারঘাট দশরথদেব স্টেডিয়ামের কাজ নিয়ে ঝামেলার জের ধরে খুন হয়েছিলেন সিপিআইএমের ছাত্র নেতা সেলিম মিয়া। ১৯৯৫-সালের কোনো এক নির্জন দুপুরে বড়দোয়ালি স্কুলের পেছনে আততায়ীরা খুন করেছিলো সেলিম মিয়াকে। সেলিম খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলো পুলিশ নেতা স্বপন দাস। ১৯৯২-র পুলিশ আন্দোলনের অন্যতম কান্ডারীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।স্বাভাবিক ভাবেই স্বপন দাসও ছিলেন সিপিআইএমের ঘরের ছেলে। সেলিম হত্যার পর দলের উপর ক্ষোভ করে স্বপন দাস যোগ দিয়েছিলেন কংগ্রেসে। সেলিম খুনের এক বছরের মধ্যে রাতের আঁধারে দুষ্কৃতীরা বাড়িতে প্রবেশ করে স্বপন দাসকে খুন করেছিলো। সেলিম হত্যার পর দুস্কৃতীরা প্রকাশ্যে বলেছিল,”সেলিম মিয়ার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীর আগে স্বপন দাসকে খুন করবে”। সেলিমের লোকজন তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে সক্ষম হয়।
শহর দক্ষিণের পর পর গ্যাং ওয়ারে পর পর দুইটি হত্যাকাণ্ডের পর শহরে নিগোসিয়েশন বাণিজ্যের আরো জোয়ার এসেছিলো।এর খেসারত দিয়ে হয়েছিলো সদর এসডিএম সুখুরাম দেববর্মার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।সুখুরাম দেববর্মার হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য সিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।কিন্তু সিবিআই খুনিদের কেশগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ গোটা চিত্র নাট্যের পেছনে ছিলো বাম নেতৃত্বের সুচতুর মস্তিষ্ক।যদিও গত বছর বিজেপি সরকার সুখুরাম দেববর্মা হত্যাকাণ্ডের পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
এই সময় কালের মধ্যেই খুন হয়েছিলেন কংগ্রেস বিধায়ক মধুসুধন সাহা।এফসিআইয়ের ভাগ বাটোয়ারা নিয়েই বাড়ির সামনে খুন হয়েছিলেন বনমালীপুরের এই বিধায়ক।আততায়ীরা খুব সামনে থেকে গুলি করে তাকে হত্যা করেছিলো।তার খুনিরা আজও অধরা।
তৎকালীন সময়ে একের পর এক গ্যাং ওয়ারে বলি হয়েছিলো বর্ডার গোলচক্করের সঞ্জিব দেবনাথ ওরফে সঞ্জু,কুট্টি মিয়া, আব্দুল হক,আবুল মিয়া,রতন মিয়া, শহরের সূর্য চৌমুহনীতে খুন হয়েছিলেন যুব কংগ্রেস নেতা দেবল দেব।পূর্ব আগরতলায় ধনঞ্জয় ঘোষ,মন্টু দাস, সুপারি কিলার শ্যামল বর্ধন খুন হয়েছিলো।শহরে গ্যাং-ওয়ারের সর্বশেষ বলি ছিলো দুর্গা চৌমুহনীর দিলীপ ঘোষ।
রাজধানীর অপরাধ লেখচিত্রে আজও বাম জামানায় খুন হওয়া মাফিয়া সর্দারদের নাম জ্বলজ্বল করছে।প্রতিটি গ্যাং-ওয়ারের পর বাম নেতাদের ম্যানেজ করা খাকি উর্দি ওয়ালারা এলোপাথাড়ি দৌড়ঝাঁপ করে আনকোরা যুবকদের গ্রেপ্তার করে মামলার গতিপথ ঘুরিয়ে দিতো অন্যপথে। এবং বাম পুলিশ আদালতে জমা করতো দুর্বল চার্জশিট।স্বাভাবিক ভাবেই মামলার মূল অপরাধীরা বেঁচে যেতো আইনের ম্যারপেচঁ দিয়ে। তদন্তকারী পুলিশ ও আইনজীবীদের যোগসাজসেই অপরাধীরা রক্ত ঝরিয়েও মুছে নিতো হাত।
বাম জামানায় বিভিন্ন মামলায় পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীদের কার্যকলাপ দেখাশুনার জন্য ছিলো “ডিরেক্টর অফ প্রসিকিউশন”।কিন্তু ডিরেক্টর অফ প্রসিকিউশনের অবস্থা ছিলো অথৈ জলে।অবাক করার মতো বিষয় বাম জামানায়
ডিরেক্টর অফ প্রসিকিউশন বিভাগে কোনো ডিরেক্টর ছিলো না।শুধুমাত্র ডেপুটি ডিরেক্টর দিয়ে চলতো কাজকর্ম।যার মাসিক বেতন ছিলো পঞ্চাশ হাজার টাকা।তৎকালীন সময়ে মামলার বাদী পক্ষের লোকজনের অভিযোগ ছিলো, তদন্তকারী পুলিশ, সরকারি আইনজীবীরা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে বিভিন্ন মামলায় দুর্বল চার্জশিট জমা দেওয়া এবং আইনজীবীরা আদালতে নিম্নমানের সওয়াল করলেও কোনো হেলদোল ছিলো না তৎকালীন ডিরেক্টর অফ প্রসিকিউশনের দায়িত্ব প্রাপ্ত ডেপুটি ডিরেক্টরের। তার ফলে অবশ্যই বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের নির্দ্বিধায় আইনের চক্রবুহ্য থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন। তাই তদন্তকারী পুলিশ, সরকারি আইনজীবী, ডিরেক্টর অফ প্রসিকিউশনের ত্রিবেণী সঙ্গমে রাজ্যের আদালতগুলিতে থাকা বিভিন্ন মামলায় দিনের পর দিন কমতে ছিলো ‘কনভিকশন’ বা ‘সাজা’র হার। তবে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর আইনমন্ত্রী রতনলাল নাথ বাম জামানায় “কামধেনু” ডিরেক্টর অফ প্রসিকিউশন পোস্টটি বাতিল করে দিয়েছেন।আইনমন্ত্রী বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন এই “পদ”টি রাখা মানেই সরকারি অর্থে অপচয়।তাই এই পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।বলছেন আইনের লোকজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.