*অভিজিৎ ঘোষ*
——————————


১৯৯৩ থেকে ২০১৪।
টানা ২১বছর।
রাজ্যে বামেরাই শেষ কথা। বামেদের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। রাজ্যের তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসে এমন কোনো নেতা ছিলো না মানিক সরকারের জনপ্রিয়তাকে টপকে যেতে পারেন।রাজ্যের মানুষ ধরেই নিয়েছিলেন মানিক সরকারকে কুপোকাত করার কোনো রাজনৈতিক শক্তি রাজ্যে আসবে না।বাম নেতা -কর্মী সমর্থকরাও ভেবে ছিলো ত্রিপুরা তাদের “পৈতৃক সম্পত্তি।”
রাজ্যের মানুষ যখন ধরেই নিয়েছিলো এই রাজ্যে আর পরিবর্তন সম্ভব নয়,তখন আগমন ঘটে এক প্রকৃত “লিডারে”র। তিনি বিপ্লব কুমার দেব।২০১৫ সালে আসেন রাজ্যে,কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে।
রাজনৈতিক নিন্দুকেরা তখন বলাবলি করতেন,”এই ছেলে কে দিয়ে কিছু হবে না,কোথায় মানিক সরকারের মত রথী, আর কোথায় বিপ্লব কুমার দেব।” মানুষ বলবেই না কেন,রাজনীতির গ্ল্যামারের পরিমণ্ডলে মানিক সরকারের ধারে কাছে ছিলেন না বিপ্লব কুমার দেব।
কিন্তু প্রকৃত লিডার যে কখনো হার মানেন না।হয়তো বা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটু আগ বাড়িয়ে বলে ফেললাম। এখনো এত বড় কথা বলার সময় হয়তো বা এখনো আসেনি।কিন্তু এতে কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে।প্রয়োজন পড়লে সমালোচনা করতে যখন কাউকে ছাড়ি না,তখন কেউ ভালো কাজ করলে,তার প্রশংসা করতে ক্ষতি কোথায়?
২০১৮-বিধানসভা নির্বাচনে আগে যারা ত্রিপুরার রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ রাখেন এবং যারা বোদ্ধা,তাদের বেশির ভাগের সঙ্গেই আলোচনা করে ভোটের রেজাল্ট কি হতে পারে আগেই আচ করতে পেরেছিলাম। তখন বোদ্ধাদের মন থেকেও কেটে গিয়েছিলো সন্দেহের কালো মেঘ।তাঁরাও বলতে শুরু করেছিলেন “এই ছেলেকে(বিপ্লব কুমার দেব) দিয়ে বামেদের বধ করা সম্ভব হবে।” কারণ রাজনীতিতে প্রাজ্ঞ না হলেও দুর্দণ্ড প্রতাপ কমিউনিস্ট নেতা মানিক সরকারের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা আছে নেতৃত্বের সহজাত বৈশিষ্ট্য।তবে এই বাস্তব কথাটাকে কেউ মেনে নিতে নাও পারেন।
২০১৬-র মাঝামাঝি থেকে রাজ্যে বইতে শুরু করে জোরদার পরিবর্তনের হাওয়া। কিন্তু টানা ২৫ বছরের গদি বদল তখনও দূরে বেশ খানিকটা।
১৯৭৮-এ বামেরা রাজ্যে প্রথম ক্ষমতায় আসে।দেখতে দেখতে নৃপেন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে প্রথম দশ বছর বেশ ভালো ভাবে কাটিয়ে দিয়েছিলো।ব্যতিক্রম ছিলো ১৯৮০-র জুনের ভ্রাতৃঘাতি দাঙ্গা। তারপরের পাঁচ বছর ক্ষমতা থেকে দূরে ছিলো বামেরা।অর্থাৎ ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৩। তবে পাঁচ বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ায় বামেরা। ৯৩-র বিধানসভা নির্বাচনে ফের দখল করে ক্ষমতা। ১৯৯৩ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ভাল-মন্দে কাটিয়ে দিয়েছিলো বামেরা।তারপরই বেরিয়ে পড়ল বামেদের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দানবতন্ত্রের আসল মুখাবয়ব।ক্ষমতার আস্ফালনে মানুষকে হেয় করার দম্ভ নিয়ে স্তালিনবাদী শাসন কোন জায়গাতে পৌঁছে ছিলো তা হারে হারে টের পেয়েছিলো এই রাজ্যের মানুষ। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে যারা বঞ্চিত,অত্যাচারিত,একমাত্র তাদেরই প্রতিশোধ স্পৃহা আর “খুন কা বদলা খুন”–এর রাজনীতির মধ্যদিয়েই প্রথমে আসে রক্তপাত,আর তারপর সেই পিচ্ছিল পথ ধরে আসে আক্ষরিক “পরিবর্তন”।
রাজ্যে বাম শাসনের আবাসন অর্থাৎ এই পরিবর্তনের কান্ডারী কে? মানুষ বলবেন নরেন্দ্র মোদি। অবশ্যই পরিবর্তনে মোদির ফ্লেভার কাজ করেছে “ম্যাজিকে”র মত।কিন্তু দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে বামেদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস কে দেখিয়েছিলেন? অবশ্যই বলতে বাধা নেই তিনি বিপ্লব কুমার দেব। মানুষ বিজেপি”র এই মুখিয়াকে দেখে তাঁর উপর আস্থা রেখেছিলো।এর আগে বিরোধী দল কংগ্রেসের কোনো নেতার প্রতি মানুষ এই আস্থা রাখতে পারেননি।তাই কংগ্রেস নেতারা রাজ্যের মানুষকে পরিবর্তনের স্বাদ এনে দিতে পারেন নি।
আমি বলো ২০১৮-র বিধানসভা নির্বাচনে ভোট ময়দানে একজন যোগ্য অধিনায়কের মত ঝড়ো ইংনিস খেলেছিলেন বিপ্লব কুমার দেব।অবশ্যই তার সাপোর্টিং সতীর্থ সুনীল দেওধর ছিলো।কিন্তু মানুষ কিন্তু ভোট দিয়েছেন নতুন মুখ বিপ্লব কুমার দেবকে দেখেই। বাদবাকি সবাই ছিল তাঁর সহকারী। ভোট মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলা-হিন্দির মিশেলে বিপ্লব কুমার দেব বলেছিলেন “এবার রাজ্যের মানুষকে পরিবর্তনের স্বাদ এনে দেবো।” তখন অবশ্যই অতি বড় বিজেপি সমর্থকও শঙ্কায় ছিলেন।আর থাকাটাই স্বাভাবিক।কারণ কংগ্রেসের তাবড় নেতারা পরিবর্তন আনতে পারেন নি।আর রাজনীতিতে “আনকোরা”(নিন্দুকদের ভাষায়) এক ব্যক্তি বলছেন বামেদের ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন? এটা কিভাবে সম্ভব। ভোট গণনা পর দেখা গেলো প্রচন্ড আত্ম বিশ্বাসের সঙ্গে বলা অধিনায়কের বক্তব্যই বাস্তবায়িত হলো।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মোদি-শাহ প্রত্যাশিত ভাবেই বিপ্লব কুমার দেবকেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সঁপে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে সরকারি দপ্তর গুলিতে ঘুণে ধরা সংস্কৃতির অবসান করার জন্য নেমে পড়েন তিনি।একজন প্রকৃত নেতার মতোই সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশ দেন দিনের কাজ দিনেই শেষ করতে হবে।এর আগে কোনো মুখ্যমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের এই নির্দেশ দিয়েছিলেন কিনা আমার জানা নেই।পরিবর্তন এনেছেন রাজ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ত্রিপুরাকে দেশ ও বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্যও উদ্যোগ নিয়েছেন বিপ্লব কুমার দেব। নানান প্রকল্পও চালু করেছেন রাজ্যে। একজন প্রকৃত লিডার থেকে মানুষ এটাই আশা করেন। তারপরও তাঁকে নিয়ে পর নিন্দা-পর চর্চার অভাব নেই। ভুল হলে মানুষ সমালোচনা করবেই,মুখ্যমন্ত্রীকেও এটা সহ্য করতে হবে।কিন্তু তারজন্য সত্যটাকে গোপন রেখে নয়।
বর্তমনে একটা শক্তি সক্রিয় হয়েছে।প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মুন্ডপাত করছে।এই শক্তি রোজ বিপ্লব কুমার দেবকে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি থেকে নামিয়ে দিচ্ছে।কিন্তু বার বার নিরাশ হচ্ছেন তারা।কাজের কাজ হয়নি।সংশ্লিষ্ট লোকজনের ভাবা উচিত রাজ্য বিজেপিতে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসানোর জন্য বিপ্লব কুমার দেবের আছে কি? বা এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে যে বিপ্লব কুমার দেবকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে নামিয়ে দিতে হবে?ভুল মানুষ মাত্রই হয়।ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন।কারণ নিন্দুকরাও তো আগেই বিপ্লব দেবকে আনকোরা বলে সার্টিফিকেট দিয়েছিলো।তাহলে এখন গেল গেল রব কেন? মন্ত্রিসভা পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই “আনকোরা” লোকটা কিন্তু মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। হয়তো বা এটা কাউর কাছে ঋণাত্মক মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে।তাতে অবশ্যই কিছু যায়-আসে না বিপ্লব কুমার দেবের।
পরিশেষে বলা যেতে পারে বিপ্লব যে ভাবে এগোচ্ছেন,যে প্যাশন আঁকড়ে ধরে কাজ করে চলছেন,তাতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।আমার দৃঢ় বিশ্বাস বিপ্লব কুমার দেব তাঁর নিজের অবস্থান ভালো ভাবেই জানেন।
আশা করি মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব জানেন,১৮-র বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআইএম যে শতাংশের হিসাবে খুব বেশি ভোটে পিছিয়ে ছিল না।সিপিআইএম গত বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত-পর্যদুস্থ ঠিকেই কিন্তু একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তবে বিপ্লব কুমার দেব যদি বাইরের কথা কানে না দিয়ে নিজের অসামান্য নেতৃত্বের ছাপ রেখে কাজ করে যান,তাহলে রাজ্যে সিপিআইএম’র ইতিহাস হতে আর বেশি সময় লাগবে না। এখন নতুন সংযোজন তৃনমূল কংগ্রেস।এখন পর্যন্ত “মূল” স্থাপন করতে পারেনি তৃণমূল।তবে ভবিষ্যতে তারা কতটা কি করতে পারবে তা বলবে সময়েই।
বিপ্লব কুমার দেব প্রতিদিন কমপক্ষে ১২ থেকে ১৩ ঘন্টা কাজ করছেন,তবু তিনি সময় পাচ্ছেন না।এখনো কত কাজ বাকি।এটাই আশা জাগাছে মানুষের মনে।
আমি মনে করি পরিবর্তনের দায়বদ্ধতা থেকেই বিপ্লব কুমার দেবের ” ডু ইট নাও”মেজাজ। তাই সময় নষ্ঠ না করে,কান কথা না শুনে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।এটাই রাজ্য রাজনীতিতে হতে পারে ” দ্য বিপ্লব কুমার দেব লিডারশিপ থিওরি”। রাজ্য রাজনীতির জন্য এটা মাইলস্টোনও হতে পারে বটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.