লরির স্থায়ী নম্বর প্লেটের নম্বর এনএল০২এন – ৯৭১৫।

ডেস্ক রিপোর্টার,আগরতলা।।
রাজ্যে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে আন্তঃরাজ্য গাড়ি চোরচক্র। তবে তাদের পোশাকি নাম ‘লোন রিকোভারি এজেন্সি। রিকোভারি এজেন্সির নাম করে গাড়ির চোরচক্রের পাণ্ডারা নিয়মিত তাদের নিটোল নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে গোটা রাজ্যে। এই নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল পুলিশও। কিন্তু পান্ডাদের নোটের গন্ধে পুলিশ মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। তবে বেশ কয়েকজন সৎ নিষ্ঠাবান পুলিশ আধিকারিক ইতিমধ্যেই আন্তঃরাজ্য গাড়ি চোরচক্রের রেকেটের শিকড়ে পৌঁছার জন্য তৈরি করেছে নির্দিষ্ট রোডম্যাপও। খুব শীঘ্রই তাদের পুলিশ জালে তুলতে সক্ষম হবে বলে আরক্ষা দফতর সূত্রের খবর।

রাজধানীর পুলিশের খবর অনুযায়ী, গত বছর এলএন০২ এন-৯৭১৫ নম্বরের একটি লরি আটক করে এইচডিএফসি’র ব্যাঙ্কে লোন রিকোভারি এজেন্সির কর্মী দীপঙ্কর কর। তার বাড়ি শহর দক্ষিণের বড়দোয়ালি এলাকায়। দীপঙ্কর গাড়িটিকে নিয়ে রেখে দেয় কাশীপুরস্থিত শ্রীরাম ফাইন্যান্স কোম্পানির পার্কিং প্লেসে। কিছুদিন যাওয়ার পর শ্রীরাম ফাইনান্সের পক্ষ থেকে দীপঙ্করকে জানিয়ে দেওয়া হয় এই লরি এখানে রাখা যাবে না। কারণ এটা এইচডিএফসি থেকে ফাইন্যান্সে নেওয়া গাড়ি। অন্য ফাইন্যান্স কোম্পানি থেকে নেওয়া গাড়ি শ্রীরাম ফাইন্যান্সের পার্কিং প্লেসে রাখা যাবে না। তারপরও এইচডিএফসির লোন রিকোভারি এজেন্সির কর্মী দীপঙ্কর কর লরিটিকে নিয়ে যান নি।

স্থায়ী নম্বর প্লেটের উপর কাগজ দিয়ে সাঁটানো জম্বু কাশ্মীরের নম্বর (জেকে ০২এএল- ২৫১১)।

সম্প্রতি দীপঙ্কর কর কাশীপুরস্থিত শ্রীরাম ফাইন্যান্সের পার্কিং প্লেসে থাকা লরিটিকে আনার জন্য যান। সেখানে গিয়ে দীপঙ্কর লরির নম্বর প্ল্যাট পরিবর্তন করে দেন। নতুনভাবে লরির স্থায়ী নম্বর প্লেটের উপর কাগজ দিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের নম্বর সেঁটে দেন। লরিটির বর্তমান নম্বর জে কে ০২ এএল-২৫১১। আইন অনুযায়ী,দীপঙ্কর এই কাজ করতে পারেন না। এটা একটা মারাত্বক অপরাধ।এখানেই তার কুমতলব প্রকাশ্যে চলে আসে।দীপঙ্কর করের এই কার্যকলাপ দেখে সন্দেহ হয় শ্রীরাম ফাইনান্সের কর্মরত লোকজনের। দীপঙ্কর তাদেরকে এইচডিএফসির একটি ক্লিয়ারেন্সের চিঠিও দেখিয়ে দেয়। দীপঙ্কর দাবি করে, এই লরিটি এইচডিএফসি থেকে এখন ক্রয় করেছেন
বিশালগড়ের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ সাহা ওরফে বিশু। স্বাভাবিক ভাবেই শ্রীরাম ফাইনান্স কর্তৃপক্ষ লরিটি ছেড়ে দেয়। অভিযোগ, দীপঙ্কর কর এইচডিএফসি-র যে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট শ্রীরাম ফাইনান্স কর্তৃপক্ষকে দেখিয়েছে এটিও ভুয়ো।শেষ পর্যন্ত বিষয়টি পৌঁছে যায় রাজধানীর পুলিশের কানেও। এই ঘটনার পর সন্তর্পণে তদন্তে নামে রাজধানীর পুলিশের একাংশ। তখনই কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসে সাপ।
অনুসন্ধানকারী পুলিশ জানতে পারে, এই দশ চাকার লরির মালিকের নাম সাহাবুদ্দিন। তার বাড়ি অসমে। তদন্তকারী পুলিশের তথ্য অনুযায়ী,এইচডিএফসি থেকে এন এল ০২ জন ১৭১৫ এই নম্বরে গাড়ির ফাইন্যান্স করা হয়েছিলো। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয়, কাশীপুর শ্রীরাম ফাইন্যান্সের পার্কিং প্লেসে থাকা এনএল ০২ এন- ৯৭১৫ লরির ইঞ্জিন নম্বর ও চেসিস নম্বর লোন নেওয়া লরির সঙ্গে কোনো সাদৃশ্য নেই। এটাও কি সম্ভব? তাহলে অপরাধের গভীরতা কতটা? তাতে পুলিশের সন্দেহ আরো গাঢ় হয়। গোটা চক্রের বুদ বুদ গন্ধ পেয়ে যায় রাজধানীর পুলিশ। আরো কিছু তথ্য প্রমাণের জন্য এই মুহূর্তে বসে আছে শহরের পুলিশ।

লরির মালিকের নাম শাহাবুদ্দিন।

তদন্তকারী পুলিশের তথ্য বলছে,এই মুহূর্তে লোন রিকোভারি এজেন্সির কর্মী তথা গাড়ি চোরচক্রের পান্ডা দীপঙ্কর কর লরিটিকে বিশালগড়ে নিয়ে রেখে দিয়েছে। তার দাবি, বিশালগড়ের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ সাহা ওরফে বিশু গাড়িটি ক্রয় করেছেন। রাজধানী পুলিশ বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে বিশালগড় থানার পুলিশকে। বিশালগড় থানার পুলিশ খতিয়ে দেখছে গোটা ঘটনা। বেসরকারি ফাইন্যান্স কোম্পানির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লোকজনের সন্দেহ, বিশালগড় থানার পুলিশকে দীপঙ্কর কর ও বিশ্বজিৎ সাহা ম্যানেজ করে নিয়েছে।এই নিয়ে শুক্রবার দিনভর বিশালগড় থানার পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে আন্ত:রাজ্য গাড়ি চোর চক্রের পান্ডা দীপঙ্কর কর ও বিশ্বজিৎ সাহা। অভিযোগ, বিশালগড় থানার পুলিশও চোর চক্রের দেওয়া মোটা অঙ্কের অর্থের টোপ গিলে ফেলেছে। এই কারণেই গাড়িটি এখন পর্যন্ত বিশালগড় মোটরস্ট্যান্ডে নিশ্চিতভাবে অবস্থান করছে। অথচ গাড়ির মূল নম্বর প্ল্যাট এনএল০২এন-১৭১৫।

লোন রিকোভারী এজেন্সির কর্মী দীপঙ্কর কর।

তার উপরে সাদা কাগজ দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে জেকে০২ এএল-২৫১১ নম্বরটি। অর্থাৎ লরিটিতে আচমকা নাগাল্যান্ডের নম্বর থেকে জম্মু-কাশ্মীরের নম্বর লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি অবশ্যই বিশালগড় থানার পুলিশের এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। তা সত্বেও পুলিশ না দেখার মতোই ভান করে আছে বলে খবর।

ভুয়ো ভেহিকেল রিলিজ অর্ডার!

এই ঘটনায় প্রমাণিত হয় রাজ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে আন্তঃরাজ্য গাড়ি চোরচক্রের পাণ্ডারা। লোন রিকোভারি এজেন্সির নামে তারা বহি:রাজ্যের গাড়িগুলিকে নম্বর প্ল্যাট পাল্টে দিয়ে এই রাজ্যে বিক্রি করে দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত রাজ্যের পরিবহন দফতর ও পুলিশের একাংশ।

শ্রীরাম ফাইন্যান্সের পার্কিং প্লেসে থাকা লরিটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিশালগড়ে।


অর্থাৎ চোরচক্রের পান্ডা, পরিবহন দফতরের কর্মী, ও পুলিশ কর্মীদের ত্রিবেণী সঙ্গমেই রাজ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে আন্তঃরাজ্য গাড়ি চোরচক্রের কুশীলবরা। এই ঘটনার সঙ্গে বিভিন্ন ফাইন্যান্স কোম্পানির লোকজনও জড়িত রয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.