ডেস্ক রিপোর্টার,৩১ডিসেম্বর।।
ইন্দিরা ভবন থেকে তৃণমূল ভবন। তারপর সরকারী কর্মচারী ফেডারেশনের সদর দপ্তর। অবসান হলো দীর্ঘ ‘জার্নি’র।
আগরতলা পুর নিগমের পৌষের শীতের আঁচড়ে ম্লান হলো রাজ্য রাজনীতির “ঐতিহাসিক” বাড়ির সন্মান। সরকারী নিয়ম মেনেই বাড়ির একাংশ ভেঙে দিলো এএমসি’র বুলডজার। ঘটনা শুক্রবার কাক ভোরে শহরের জ্যাকসন গেটে।
আগরতলা শহরের জ্যাকসন গেটে অর্থাৎ মহারানী তুলসীবতী স্কুলের বিপরীত দিকের বাড়িটি রাজ্যের অবাম রাজনীতির বহু ঘটনার সাক্ষী।রাজ্য রাজনীতির অঙ্গন ও তার বাইরের লোকজনের কাছে বাড়িটির পরিচয় “ইন্দিরা ভবন” হিসাবে।পরবর্তী সময়ে রাজ্য রাজনীতির কালের বিবর্তনে এই বাড়ির নামকরণ হয়েছিলো “তৃণমূল ভবন”।
২০১৮-সালের প্রাক লগ্নে কংগ্রেসের কর্মচারী ফেডারেশন বিজেপিকে সমর্থন করেছিলো।সেই সুবাদে পোস্ট অফিস কংগ্রেস ভবনের পাশ থেকে কর্মচারী ফেডারেশনের অফিস স্থানান্তরিত হয়ে এসেছিলো জ্যাকসন গেটেই এই ” ঐতিহাসিক বাড়িতে”। এএমসির আঁচড়ে শেষ দিন পর্যন্ত “সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন” অফিসের নাম ফলক জ্বলজ্বল করছিলো বাড়িতে।
রাজনীতিকরা বলছেন,এক সময় এই বাড়িটি ছিলো অবাম আন্দোলনের সূতিকাগার। এই বাড়িতে বসে বাম বিরোধী বহু আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু পশ্চিম বাংলার কংগ্রেস-সিপিআইএম এক মঞ্চে এসে তৈরি করেছিল নতুন মেরুকরণ।তখন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দল নেতা সুদীপ রায় বর্মন কংগ্রেস ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসে।তার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ এক ঐতিহ্যের আবাসন ঘটে জ্যাকসন গেটের বাড়িতে। তার নামকরণ হয়েছিলো “তৃণমূল ভবন”। তখন অর্থাৎ ২০১৬-সালে বাম-রাম দুই রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আতুর ঘর ছিলো এটি। জ্যাকসন গেটের এই বাড়ির সংগঠন দেখে ভরকে উঠেছিলো তৎকালীন শাসক দল সিপিআইএম। আগরতলা পুর নিগমকে কাজে লাগিয়ে জ্যাকসন গেটের বাড়ি(তৎকালীন তৃণমূল ভবন) ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল মানিক সরকারের প্রশাসন।কিন্তু বামেদের বিরুদ্ধে মানুষের জেহাদ এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিলো বাড়িটি রক্ষার সহস্রাধিক মানুষ রাস্তায় নেমে গিয়েছিলো। ঝামেলা এড়াতে বাম প্রশাসন কয়েকবার চেষ্টা করেই বাড়িটিতে আঁচড় দেওয়ার দুঃসাহস দেখায় নি। এক প্রকার বাধ্য হয়ে পিছু হটেছিলো বাম পরিচালিত আগরতলা পুর নিগম।
ইন্দিরা ভবনের পরিবর্তে জ্যাকসন গেটের বাড়িতে লাগানো তৃণমূল কংগ্রেসের নাম- ফলকও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ তৎকালীন সময়ে রাজ্য রাজনীতির বিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সুদীপ রায় বর্মন, আশীষ সাহা সহ তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত নেতা-বিধায়ক সহ কর্মীরা ঝাঁপ দিয়েছিলো বিজেপি শিবিরে। সঙ্গে সঙ্গে জ্যাকসন গেটের বাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিলো মা-মাটি-মানুষের সাদা-সবুজ পতাকা।অঘোষিত ভাবে জ্যাকসন গেটের বাড়িটি হয়ে যায় রাজ্য বিজেপি’র আউট-লেট।সুদীপ-আশীষ পন্থীরা বিজেপি’র কৃষ্ণনগর সদর দপ্তরে না গিয়ে আউট-লেটে বসেই চালাতেন নিজেদের সাংগঠনিক কার্যকলাপ।তৎকালীন সময়েই কগ্রেসের সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন অফিসটি চলে আসে তুলসীবতী স্কুলের বিপরীতে থাকা এই বাড়িতে।
রাজনীতিকদের দাবি, রাজ্য বিজেপি’র অন্তরকলহের পর জ্যাকসন গেটের বাড়িটি হয়ে যায় সংস্কারপন্থীদের রাজনীতির পীঠস্থান। এখানে বসেই তারা নিজেদের রাজনৈতিক কর্ম-কাণ্ডের রূপরেখা তৈরি করতো। অর্থাৎ প্রদেশ বিজেপি’র নেতৃত্বের কথায়, ” জ্যাকসন গেটের এই বাড়িটি ছিলো স্বদলীয় বিরোধী শিবিরের আখড়া”।
সম্প্রতি আগরতলা পুর নিগম এই বাড়ির মালিক বিজেপি’র বিধায়ক আশীষ সাহাকে ঘর ভাঙার নোটিশ পাঠিয়ে ছিলো।দাবি নিগম কর্তৃপক্ষের।পাঠানো নোটিশের প্রেক্ষিতেই শুক্রবার কাক ভোরে বিজেপি’র স্বদলীয় বিরোধী শিবিরের আখড়া ভেঙে দিয়েছিলো
পুর নিগম কর্তৃপক্ষ।
রাজনৈতিক বিশারদরা বলছেন, টানা ২৫বছরের বাম রাজত্বে শহরের জ্যাকসন গেটের অবাম রাজনীতিতে আতুর ঘর ভাঙতে পারে নি দশরথ-মানিকের প্রশাসন।কিন্তু পেরেছে বিপ্লব কুমার দেবের বিজেপি সরকার।অর্থাৎ ঘুরিয়ে বললে, দশরথ-মানিকরা ব্যর্থ হলেও সফল বিপ্লব।গুঁড়িয়ে দিলেন স্বদলীয় বিরোধী শিবিরের রাজনীতির আতুর ঘর।যার পোশাকি নাম “সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন অফিস।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.