“এই দোকানে কোনো ঠাকুর দেবতার ছবি রাখা যাবে না। তাহলে দোকানের মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার হারাম হয়ে যাবে। মুসলমানের দেশে হারাম খাবার বিক্রি করা যাবে না।”দোকানের হিন্দু কর্মচারী অনন্ত দাস উগ্র মুসলিম যুবক মামুন মিয়ার বক্তব্যের প্রতিবাদ করে। তখনই শুরু হয় বাকবিতণ্ডা।
ঢাকা প্রতিনিধি, ১৮ জানুয়ারি।।
খুনের জন্য প্রয়োজন শুধু ইস্যুর। তার জন্য নিত্য নতুন ইস্যু খোঁজে বের করে ইউনূসের দেশের মৌলবাদীরা। সংশ্লিষ্ট ইস্যুকে সামনে রেখে হিন্দু নিধন যজ্ঞ শুরু করেছে ওপার বাংলার কট্টরপন্থীরা।
দোকানে কেন হিন্দুর ঠাকুর – দেবতার ছবি থাকবে? যদি, দোকানে হিন্দু দেবদেবীর ছবি থাকে তাহলে সেই দোকানের খাবার – মিষ্টি হালাল হবে না। আর দোকানের খাবার – মিষ্টি হালাল না হলে, খুন করতে হবে দোকানিকে। অর্থাৎ ঘুরিয়ে বললে, বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দুরা তাদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে ঠাকুর – দেবতার ছবি রাখলেই তাঁকে খুন হতে হবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। বাংলাদেশে হিন্দু নিধনের এই নতুন কৌশলের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা গেল গাজীপুরে।
মিষ্টির দোকানে ঠাকুর – দেবতার ছবি রাখার অপরাধে খুন হয়েছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের এক মিষ্টি ব্যবসায়ী। তার নাম লিটন চন্দ্র ঘোষ ওরফে কালী ময়রা (৫৫)।তিনি কালীগঞ্জ পৌরসভা সংলগ্ন বড়নগর সড়কে অবস্থিত “বৈশাখী সুইটমিট অ্যান্ড হোটেলে”র মালিক। অবশ্যই স্থানীয় পুলিশ মূল খুনি মাসুম মিয়া (২৮) ও বাবা স্বপন মিয়া (৫৫) ও মা মাজেদা খাতুনকে (৪৫) গ্রেফতার করেছে।তাদের বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার বালীগাঁও এলাকায়। ঘটনা শনিবার সকাল ১১টা নাগাদ।
খুন হওয়া হিন্দু মিষ্টি ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র দাসের পরিবারের বক্তব্য, ঘটনার সকালে মামুন মিয়া নামে এক যুবক আসে লিটন চন্দ্র ঘোষের বৈশাখী সুইটমিট অ্যান্ড হোটেলে। ব্যবসায়ী হিন্দু হওয়ার সুবাদে, স্বাভাবিক ভাবেই তার দোকানে হিন্দু দেবদেবীর ছবি লাগানো ছিলো। খদ্দের মামুন মিয়া ঠাকুর – দেবতার ছবি দেখে দোকানের কর্মচারী অনন্ত দাসকে ডেকে আনে। এবং বলে, “এই দোকানে কোনো ঠাকুর দেবতার ছবি রাখা যাবে না। তাহলে দোকানের মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার হারাম হয়ে যাবে। মুসলমানের দেশে হারাম খাবার বিক্রি করা যাবে না।”
দোকানের হিন্দু কর্মচারী অনন্ত দাস উগ্র মুসলিম যুবক মামুন মিয়ার বক্তব্যের প্রতিবাদ করে। তখনই শুরু হয় বাকবিতণ্ডা।
একপর্যায়ে মাসুম মিয়া দোকানকর্মী অনন্ত দাসকে বলে, “তুই ব্যাটা হিন্দু, তোর মালিকও হিন্দু। মুসলমানের দেশে থেকে দোকানে ঠাকুর দেবতার ছবি রাখিস, আবার মুসলমানের সাথেই মুখে মুখে তর্ক করার সাহস তোর হয় কী করে? হিন্দু হওয়ার সাধ মিটিয়ে দিচ্ছি তোকে।” এই বলেই অনন্তকে এলোপাথারি মারতে শুরু করে মাসুম মিয়া। সঙ্গে সঙ্গেই মাসুমের বাবা স্বপন মিয়া ও মা মাজেদা খাতুন ঘটনাস্থলে এসে ছেলের সাথে মিলে দোকানকর্মী অনন্ত দাসের উপর হাত চালায়।তখন দোকান মালিক লিটন ঘোষ পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং তার কর্মীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাকেও বেধড়ক মারধর শুরু করে মা – বাবা ও ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্হিতি উত্তপ্ত হলে একসময় দোকানের পাশে থাকা বেলচা দিয়ে লিটন ঘোষের মাথায় পর পর আঘাত করে তারা। ঘটনাস্থলেই দোকানের মালিক লিটন ঘোষ লুটিয়ে পড়েন। এবং কাতরাতে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লিটন।ঘটনার পরপরই উপস্থিত জনতা হামলাকারী তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
মিষ্টির দোকানের মালিক লিটন ঘোষের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “ঘটনার পরপরই জড়িত তিনজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।”
সাম্প্রদায়িক ইস্যু তুলে প্রকাশ্যে একজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আবারও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খুন হওয়া হিন্দু মিষ্টি ব্যবসায়ী লিটন ঘোষের পরিবারের সদস্যদের দাবি, পুরানো শত্রুতার জের ধরে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, মাসুমদের পুরো পরিবারটি উগ্র ইসলামী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তারা এর আগেও একাধিক হিন্দু পরিবারের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে ঝামেলার সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক উস্কানীর বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিলো।

