২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভোট হচ্ছে।
#সমীরণ রায়#
_______________
ঢাকা, ১১ ফেব্রুয়ারি।।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বদলে গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চ। ১৭ বছর পর পাল্টে যাওয়া পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন । ২৯৯ আসনে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা চলবে ভোট গ্রহণ। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুতে সেখানে স্থগিত করা হয়েছে ভোট। দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ভোটে অংশ নিতে পারেনি টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। ফলে আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তারা একক সংখ্যাগরিষ্টতা পাবেন এবং বিএনপি পরবর্তী সরকার গঠন করবে। পাশাপাশি ‘এবারের নির্বাচনে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ও কাউন্টার ব্যালেন্স’ সঠিকভাবে থাকায় নির্বাচনে তথাকথিত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা নেই বলেও মনে করেন বিএনপি নেতারা। অন্যদিকে একাত্তরে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামীও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবার লড়াই করছে। তবে বিভিন্ন জরীপ বলছে তারা ৫০ থেকে ৭০ টির বেশি আসন পাবে না। অন্যদিকে বিএনপি পেতে পারে ২০৮ থেকে ২২০ টি আসন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভোট হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিবন্ধিত ৬০ দলের মধ্যে এবারের নির্বাচনে ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী দুই হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী ৮৩ জন। সারাদেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন; নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার এক হাজার ২৩২ জন। নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি। ভোটকক্ষের (বুথ) সংখ্যা দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি। গড়ে প্রতি তিন হাজার ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং পরে ইসির নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনে নেই আওয়ামী লীগ। দলীয় সরকারের অধীনে আগের তিন সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল খুবই কম। এ ছাড়া জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে নানা অনিয়মের ধারাবাহিকতায় এক দশকের বেশি সময় ধরে সাধারণ ভোটাররা ছিলেন কেন্দ্রবিমুখ। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে এমন উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের ভোটেও ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বিশ্লেষকরা। তবে গত সোমবার রাত থেকেই গণপরিবহনগুলোতে রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ ভিড় বেড়েছে। সরকার ও ইসির কর্তারা ইতোমধ্যে ভোটার উপস্থিতি ৫৫ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন। ভোটের দিন বৃহস্পতিবার সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে ইসি। পাশাপাশি বুধবার নির্বাহী আদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৫০ হাজারের বেশি দেশীয় পর্যবেক্ষকের সঙ্গে ২৩ দেশ ও সাত আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। ইতোমধ্যে তারা সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধি, ইসি ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন।
অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নানা প্রতিশ্রুতি সরকার এবং ইসির পক্ষ থেকে দেওয়া হলেও ইতোমধ্যে নির্বাচনী সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তপশিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে পাঁচজন ও বেসরকারি হিসাবে ১৭ জন নিহত হয়েছেন। নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারের ওপর নানামুখী চাপ প্রয়োগের অভিযোগ জমা পড়েছে ইসিতে। যদিও এবারের নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘ ২৫ বছরের রাজনৈতিক সঙ্গী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারে বিএনপির বিজয় অনেকটাই সুনিশ্চিত বলে শুরুতে মনে করা হয়েছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সংস্থার পক্ষ থেকে জরিপ চালানো হয়েছে। তবে ২০ দিনের টানা নির্বাচনী প্রচার শেষে প্রায় অর্ধেক আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছে।
‘ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ সেল’ এক জরিপ প্রতিবেদনে দাবি করেছে, এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। ৩০০ আসনের মধ্যে দলটি একাই পেতে পারে ২২০টি আসন। অন্যদিকে এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) নামের আরেকটি সংস্থার জরিপ বলছে, নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ২০৮টি আসনে জয়লাভ করতে পারে। আর জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা ৪৬টি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ৩টি, অন্যান্য দল ৪টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৭টি আসনে জয়ী হতে পারেন।
সারাদেশের ৪২ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪০ শতাংশের ওপরে কেন্দ্রকে নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ১৫টি আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা বেশি। ইসি ২১ হাজার ৫০৬টি ভোটকেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’তথা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এবারই প্রথমবারের মতো আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে এবার মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন এবং দেশের ভেতরে ভোটার ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন। ইতোমধ্যে ৫ লাখ ১২ হাজার ৯১৬ জন প্রবাসী এবং দেশের অভ্যন্তরে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৬ জন ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৯১৯টি প্রবাসী এবং ৩ লাখ ১০ হাজার ১৫৪টি দেশের ভোটারদের ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তারা বুঝে পেয়েছেন। তবে ভোট গ্রহণের শেষ সময় বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে পোস্টাল ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে না পৌঁছলে তা গণনায় আসবে না বলে জানিয়েছে ইসি।
এদিকে সরকারি নির্দেশে মঙ্গলবারই বন্ধ হয়ে গেছে শিল্প-কারখানা। বুধ-বৃহস্পতিবার সাধারণ ছুটি, সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুক্র-শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি। লম্বা এই ছুটিতে অনেকে ঢাকা ছাড়তে শুরু করায় মঙ্গলবার সকাল থেকেই যাত্রীদের চাপ লক্ষ্য করা গেছে ঢাকার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে।
অন্যদিকে ভোটের আগের দিন থেকে বিভিন্ন শপিংমল ও বড় বড় বাজার সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণায় অনেকে জরুরি কেনাকাটাও সেরে নিচ্ছেন। ভোটের সময় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় অনেকে বেশি করে নিত্যপণ্য কিনে রাখছেন।

