আগরতলা,১৫ আগস্ট।।
         বর্তমান সরকার রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গুণগত শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, জনজাতিদের বিকাশ, মহিলা ক্ষমতায়ন, সামাজিক কল্যাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানব সম্পদ উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। গত ৭ বছরে এক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ত্রিপুরা গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ছাড়াও অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। শুক্রবার সকালে আসাম রাইফেলস ময়দানে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে রাজ্যের জনগণের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ও বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যে ত্রিপুরা এগিয়ে চলেছে। এগিয়ে চলার এই অভিমুখ আমাদের সুশাসনের নীতি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। মুখ্যমন্ত্রী ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীর জওয়ানদের আন্তরিক অভিবাদন জানান যাঁরা পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জঙ্গিদের দমনে সাফল্যের সঙ্গে ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদ দমনে সাফল্যের সঙ্গে এই অভিযান এবং পাকিস্তানি হামলার যোগ্য জবাব যেভাবে সেনাবাহিনী দিয়েছে তাতে ভারতের বীর পরাক্রমকেই সূচিত করেছে।
        আসাম রাইফেলস ময়দানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা সম্মিলিত বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। কুচকাওয়াজে সিকিউরিটি ও ননসিকিউরিটি বিভাগে ১৬টি প্ল্যাটুন অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে রাজ্য পুলিশ বাহিনীর যে সমস্ত আধিকারিক ও কর্মীগণ কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পদক পেয়েছেন তাদের পদক পরিয়ে দেন। অনুষ্ঠান শেষে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তর, ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের পরিচালনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেয়। আসাম রাইফেলস ময়দানে মূল অনুষ্ঠানে রাজ্যসভার সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, ত্রিপুরা বিধানসভার উপাধ্যক্ষ রামপ্রসাদ পাল, মুখ্যসচিব জে. কে. সিনহা, পুলিশ মহানির্দেশক অনুরাগ সহ রাজ্য প্রশাসন ও আরক্ষা প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
     অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন ‘আত্মনির্ভর ভারত’ শুধু সরকারি কার্যক্রম নয়, এটি হচ্ছে জন আন্দোলন। স্বদেশী ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিয়ে স্বদেশী সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশকে গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, স্টার্ট-আপ, গবেষণা এবং উৎপাদনে স্বদেশী চিন্তা-ভাবনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
      প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা আমাদের রাজ্যেও ‘ভোকাল ফর লোকাল’ মন্ত্রকে পাথেয় করে স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশীয় পণ্যসামগ্রীগুলি যাতে বিশ্বের বাজারে স্বীকৃতি লাভ করতে পারে তার জন্য উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর গুণগতমান বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া আবশ্যক। আমাদের অগ্রাধিকার প্রযুক্তিনির্ভর আত্মনির্ভরশীল ভারত গড়ে তোলা। এখন সময় এসেছে, দেশের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে উদীয়মান ক্ষেত্রগুলিতে গুরুত্ব দেওয়া। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, স্পেস এক্সপ্লোরেশন, বায়োটেকনোলজি ও রিনিউয়েবল এনার্জি’র উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ভারতকে বিশ্বের প্রথম সারিতে এগিয়ে যেতে হবে। এরজন্য আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্রে, ‘জয় জওয়ান, জয় কিষাণ, জয় বিজ্ঞান এবং জয় অনুসন্ধান’-কে যুক্ত করেছি। আত্মনির্ভরশীল ভারত গড়ার লক্ষ্যে আমরাও আমাদের রাজ্যকে ‘আত্মনির্ভরশীল ত্রিপুরা’ হিসাবে গড়ে তুলতে চাই।
      অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বর্তমান সরকারের সময়ে রাজ্যে যেসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে তার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজ্যের জিএসডিপি ১২.৪৬ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে। এরফলে জিএসডিপি-এর ক্ষেত্রে ত্রিপুরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। নীতি আয়োগের প্রকাশিত সূচকে ত্রিপুরা সারা দেশের মধ্যে ফ্রন্ট রানার রাজ্য হিসাবে উন্নীত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ইন্টিগ্রেটেড ক্রপ ম্যানেজমেন্ট কর্মসূচিতে ১৫ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দের মাধ্যমে ৯২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর এলাকা ধান চাষের জন্য সম্প্রসারিত করা হয়েছে। ২০ হাজার ১৬১ হেক্টর এলাকা জৈবচাষের আওতায় আনা হয়েছে। ৫ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ চালু করা হয়েছে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষকদের মধ্যে ১১ হাজার ৪৪৪টি কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের বিধ্বংসী বন্যায় ২ লক্ষ ১৩ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে ১০৯ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকার ত্রাণ হিসাবে সহায়তা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মাননিধি প্রকল্পে ২ লক্ষ ৩৮ হাজার কৃষকদের মধ্যে চলতি আগষ্ট পর্যন্ত প্রায় ২০১ কোটি টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়েছে।
     রাজ্যে কিষাণ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্পে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা কৃষি ঋণ দেওয়া হয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা’ যোজনায় ২৫ হাজার কৃষক নথিবদ্ধ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার পরিপূরক হিসাবে ২০২০-২১ সালে চালু হওয়া মুখ্যমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনায় এখন পর্যন্ত ৩২ কোটি ৭৫ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা সহায়তা ও সাবসিডি হিসাবে প্রদান করা হয়েছে। ৩৬ হাজার ৬৬১টি সয়েল হেলথ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের ২ হাজার ৮ হেক্টর এলাকায় পাম অয়েল চাষ হচ্ছে এবং এরফলে ১,৯৯১ জন কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজ্যে প্রায় ২ লক্ষ ৪৭ হাজার ৩১০ টন দুধ, ৫৯ হাজার ৭০০ টন মাংস এবং প্রায় ৩৬ কোটি ডিমের উৎপাদন হয়েছে। মাথাপিছু ডিমের উপলব্ধতায় ত্রিপুরা উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে শীর্ষ স্থানে এবং দুধ ও মাংসের উপলব্ধতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। মাছ উৎপাদনে বর্তমানে ত্রিপুরা উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং মৎস্য চাষে সর্বোত্তম পদ্ধতি গ্রহণের জন্য রাজ্যের মৎস্য দপ্তরকে কেন্দ্রীয় মৎস্য মন্ত্রক সম্মানিত করেছে।
  মূলত মহিলা ক্ষমতায়ন, জীবিকা উন্নয়ন ও বন সংরক্ষণের লক্ষ্যে এলিমেন্ট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্কের সহায়তায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই প্রকল্প চালু করা হয়। ৮২১টি গ্রামকে এই প্রকল্পের সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
   

।।বিজ্ঞাপন।।

আসাম রাইফেলস ময়দানে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজে সিকিউরিটি বিভাগে বি.এস.এফ., সি.আর.পি.এফ., আসাম রাইফেলস, টি.এস.আর. (পুরুষ ও মহিলা), মেঘালয় পুলিশ, ফরেস্ট গার্ড, ট্রাফিক পুলিশ, হোমগার্ড, ত্রিপুরা পুলিশ এবং নন-সিকিউরিটি বিভাগে এন.সি.সি. বয়েজ, এনসিসি গার্লস, গার্লস গাইড, এনএসএস, সিভিল ডিফেন্স ও আসাম রাইফেলস পাবলিক স্কুল অংশ নেয়। কুচকাওয়াজে সিকিউরিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে যথাক্রমে ১৫ নম্বর টি.এস.আর. মহিলা ব্যাটেলিয়ন, বি.এস.এফ. ও ১৪ নম্বর টি.এস.আর. পুরুষ ব্যাটেলিয়ন। নন-সিকিউরিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে যথাক্রমে আসাম রাইফেলস পাবলিক স্কুল, এনসিসি বয়েজ ও এনএসএস।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *