নোংরা রাজনীতির”অনাচারে” ত্রিপুরার লিজেন্ড স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত শচীন্দ্র লাল সিংয়ের স্মৃতি চলে গিয়েছে বিস্মিতির কৃষ্ণ গহ্বরে। এটাই কি ছিলো তাঁর প্রাপ্য?
ডেস্ক রিপোর্টার, ৮ ডিসেম্বর।। “জাল যার, জল তার/ লাঙল যার, জমিন তার।”—- এই স্লোগানের শ্রষ্টা শচীন্দ্র লাল সিং। তিনি ছিলেন রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য রাজনীতিতে তিনি ছিলেন “শচীন দা” নামে পরিচিত। ৮ ডিসেম্বর রাজ্যের এই প্রবাদ প্রতীম কংগ্রেস ঘরানার রাজনীতিবিদের ২৬ তম প্রয়াণ দিবস।”জাল যার, জল তার/ লাঙল যার, জমিন তার” – শচীন্দ্র লাল সিং তাঁর এই স্লোগানকে স্বার্থক করতে খয়েরপুর মরিয়ম নগরে থাকা বিশাল জমি দান করেছিলেন কৃষকদের। এই জমিতে চাষ বাস করতো কৃষকরা। সঙ্গে ছিলো বিশাল জলাশয়। দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের জন্ম বার্ষিকী বা মৃত্যু বার্ষিকী কোনোটাই ঘটা করে পালিত হয় নি। রাজ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু কিছু জায়গাতে পালিত হলেও, তা একে বারেই জৌলুস হীন। খোদ প্রদেশ কংগ্রেসও বিনা আড়ম্বরে পালন করে শচীন্দ্র লাল সিংয়ের জন্ম বা মৃত্যু দিন। শচীন্দ্র লাল সিং প্রয়াত হয়েছিলেন ২০০০ সালের ৮ ডিসেম্বর, দিল্লির একটি হাসপাতালে।৯ ডিসেম্বর তাঁর মৃতদেহ আনা হয়েছিলো আগরতলায়। দুইদিন রবীন্দ্র ভবনে তাঁর মৃতদেহ কফিন বন্দি ছিলো। শেষে ১১ ডিসেম্বর সম্পন্ন হয়েছিল শেষকৃত্য।
রাজ্যের জন্য কি অবদান ছিলো রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের?
রাজ্যের জন্য কি অবদান ছিলো রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের? এই তালিকা বেশ লম্বা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঢেঁকুর তোলে তাদের সরকারের মুখ্যমন্ত্রীদের সময় কালের উন্নয়নের রিপোর্ট কার্ড নিয়ে। কিন্তু এই রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী “শচীন দা’র” রাজত্বে কি কি উন্নয়ন হয়েছে? অবশ্যই এই রিপোর্ট কার্ড শোনা যায় নি রাজ্যের কংগ্রেস নেতাদের গলায়ও। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৩- র ১লা জুলাই থেকে ১৯৭১- র ১লা নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতার মসনদে ছিলেন শচীন্দ্র লাল সিং। এই সময়ের মধ্যে জিবি হাসপাতাল, পলিটেকনিক কলেজ, ওমেন্স কলেজ ডম্বুর প্রজেক্ট তৈরি করেছিলেন শচীন্দ্র লাল সিং। তাঁর সময় কালেই পশ্চিমবাংলা থেকে ত্রিগুনা সেনকে আগরতলায় এনে রাজ্যসভার সাংসদ করেছিলেন। তা ছিল শর্তসাপেক্ষে। কি ছিলো সেই শর্ত? শচীন্দ্র লাল সিংয়ের পুত্র আশীষ লাল সিং জানিয়েছেন, ” ত্রিগুনা সেনকে শচীন্দ্র লাল সিং বলেছিলেন, ” ত্রিগুনা তুমি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলে আমার রাজ্যে ওএনজিসিকে স্থাপন করতে হবে।” শুধু তাই নয়, শচীন্দ্র সিংয়ের জামানায় ত্রিপুরা পেয়েছিল পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা। তিনিই আধিপত্য বিস্তার করে ত্রিপুরার বুকে এনে ছিলেন রেল।
ত্রিগুনা সেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভায় স্থান পেয়ে শচীন্দ্র লাল সিংয়ের কথা রেখেছেন।
আশীষের বক্তব্য, ত্রিগুনা সেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভায় স্থান পেয়ে শচীন্দ্র লাল সিংয়ের কথা রেখেছেন। এবং ত্রিপুরায় ওএনজিসিকে এনে দিয়েছেন। শুধু কি তাই, শচীন্দ্র লাল সিং রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি তুলে দিয়েছেন রাজ্য সরকারকে। রাজ্য সরকারের বহু প্রতিষ্ঠান আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শচীন্দ্র লাল সিংয়ের পৈত্রিক সম্পত্তিতে।
ত্রিগুনা সেন, ( প্রায়ত প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী)
রাজন্য ত্রিপুরার ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা ছিলো শচীন্দ্র লাল সিংয়ের।
রাজন্য ত্রিপুরার ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা ছিলো শচীন্দ্র লাল সিংয়ের। জম্বু কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সাক্ষাৎ করেছিলেন তৎকালীন সময়ে ভারতের উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের সঙ্গে। ত্রিপুরাকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য তিনি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মহারানী কাঞ্চন প্রভা দেবীকেও এক প্রকার বাধ্য করিয়েছিলেন ত্রিপুরাকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করতে। এই ঐতিহাসিক তথ্য জানিয়েছেন শচীন পুত্র আশীষ।
১৯২০ সাল থেকেই ব্রিটিশ ভারতের বাংলার যুগান্তর দলের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ সূত্র ছিলো ত্রিপুরার ভ্রাতৃ সংঘের।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, শচীন্দ্র লাল সিং যুক্ত ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে। তিনি তাঁর স্কুল জীবন থেকেই আগরতলার তৎকালীন সময়ের যুবকদের সংগঠন “ ভ্রাতৃ সংঘ”র সদস্য ছিলেন। এই ভ্রাতৃ সংঘ থেকেই শুরু করেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ১৯২০ সাল থেকেই ব্রিটিশ ভারতের বাংলার যুগান্তর দলের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ সূত্র ছিলো ভ্রাতৃ সংঘের। শচীন্দ্র লাল সিং জড়িত ছিলেন অনুশীলন সমিতির সঙ্গেও।
বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে বড় অবদান ছিল শচীন্দ্র লাল সিংয়ের।
বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে বড় অবদান ছিল শচীন্দ্র লাল সিংয়ের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন শচীন্দ্র লালের বন্ধু সম। বহু দিন শেখ মুজিবুর রহমান শচীন্দ্র লালের আশ্রয়ে আগরতলায় অবস্থান করেছিলেন। এবং এখানে বসেই মুক্তি যুদ্ধের স্ক্রিপ্ট রচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই সংক্রান্ত বহু তথ্য আজও জ্বল জ্বল করছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায়। শচীন্দ্র লাল ত্রিপুরায় আশ্রয় দিয়েছিলেন হাজার হাজার শরণার্থীদের। নিজেই শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করতেন। বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের নানান সমস্যার খোঁজ খবর রাখতেন তিনি।বাংলাদেশ সরকার শচীন্দ্র লাল সিংকে মুক্তি যুদ্ধের বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সন্মাননাও জানিয়ে ছিলো।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশি শরণার্থীদের ক্যাম্পে শচীন্দ্র।
মঙ্গল পান্ডে, সরোজিনী নাইডুদের ছবি সঙ্গে লাল কেল্লায় স্থান পেয়েছিল ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের ছবিও।
শচীন সিংয়ের পুত্র আশীষ লাল সিং জানিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রের ক্ষমতায় বসার পর দেশের বাছাইকৃত স্বাধীনতার সংগ্রামীদের ছবি দিল্লির লাল কেল্লায় লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তালিকায় নাম ছিলো শচীন্দ্র লাল সিংয়ের। মঙ্গল পান্ডে, সরোজিনী নাইডুদের ছবি সঙ্গে লাল কেল্লায় স্থান পেয়েছিল ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের ছবিও। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি, পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার শচীন্দ্র লাল সিংয়ের এই ছবি দিয়েছিল রাজ্য সরকারকে। আশীষ লাল সিংয়ের কথায়, ” তাঁর বাবার ছবি রাজ্যে আনা হয় নি। এই ছবি রাখা হয়েছে দিল্লি ত্রিপুরা ভবনে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ” বর্তমানে শচীন্দ্র লাল সিংয়ের এই ছবি শোভা বর্ধন করছে দিল্লি ত্রিপুরা ভবনের গ্যারেজে। খাচ্ছে ধুলোয় গড়াগড়ি।” শচীন্দ্র লাল সিংয়ের ছবির সঙ্গে এই আচরণ কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না তাঁর পরিবারের লোকজন। আশীষ বলেন, তাঁর পিতা ত্রিপুরার জন্য জীবন – যৌবন দিয়েছেন। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দিয়েছেন সাধারন মানুষ ও সরকারকে। বিনিময়ে তাঁর পিতা কোনো সন্মান পান নি। আক্ষেপ করে আশীষ বলেন, ” ত্রিপুরা রিফিউজিদের রাজ্য। রিফিউজিরা নিতে জানে। দিতে জানে না। তাই এই রাজ্যটাকেই আমাদের পরিবার বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আজ পর্যন্ত কোনো সরকার তাঁর মর্মর মূর্তি স্থাপন করে নি মহাকরণ বা বিধানসভার সামনে।
দেশ ও রাজ্যের জন্য এতো কিছু করার পরও ব্রাত্য শচীন্দ্র লাল সিং। আজ পর্যন্ত কোনো সরকার তাঁর মর্মর মূর্তি স্থাপন করে নি মহাকরণ বা বিধানসভার সামনে। তাঁর নামে নেই কোনো রাস্তা, স্কুল – কলেজ। ৮৮- র কংগ্রেস – টিইউজেএস সুযোগ ছিলো। কিন্তু তারা তেমন কোনো উদ্যোগ নেয় নি।তাহলে জীব দশাতেই শচীন্দ্র লাল সিং দেখে যেতে পারতেন।পরবর্তীতে ক্ষমতার মসনদে থাকা বামেরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে শচীন্দ্র লাল সিংকে স্মরণীয় করে রাখার মতো কিছু করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে নি। তারা অবশ্যই করেছেন রাজ্যের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জননেতা নৃপেণ চক্রবর্তীর জন্য।তবে তাও খুব নগন্য। নৃপেণ চক্রবর্তীর নামে আনন্দনগরে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল রয়েছে। শচীন্দ্র লালের কপালে তাও জুটে নি। এখন ক্ষমতায় বিজেপি সরকার। তারা কেন ভাববে? কারণ তারাও যে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না! তাই পরিশেষে বলা যায়, নোংরা রাজনীতির”অনাচারে” ত্রিপুরার লিজেন্ড স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত শচীন্দ্র লাল সিংয়ের স্মৃতি চলে গিয়েছে বিস্মিতির কৃষ্ণ গহ্বরে।এটাই কি ছিলো তাঁর প্রাপ্য?