আগরতলা,১১ অক্টোবর।।

অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ, ত্রিপুরা (মহাবিদ্যালয় শিক্ষা)-এর বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় রবিবার। শহরের নজরুল কলাক্ষেত্র অডিটোরিয়ামে সৌহার্দ্য, শৃঙ্খলা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং শিক্ষার উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধতার পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সরস্বতী বন্দনার মাধ্যমে। এরপর বিদ্যা, কর্তব্য ও সেবার আদর্শকে স্মরণ করে মা সরস্বতীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। এই উদ্বোধনী পর্ব পরবর্তী আলোচনা ও কার্যক্রমের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে।

অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের ত্রিপুরা প্রান্তের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ রায় চৌধুরী সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সদস্যদের স্বাগত জানান। তিনি ২০২৫-২৬ বর্ষের বার্ষিক সাধারণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম ও অগ্রগতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেন। সংগঠনের প্রতি সকল সদস্যের একনিষ্ঠতা ও সার্বিকভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ, ত্রিপুরা প্রান্তের কোষাধ্যক্ষ তপনজ্যোতি মালাকার ২০২৫-২৬ বর্ষের আর্থিক আয় – ব্যয়ের বিবরণী উপস্থাপন করেন। তিনি সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদা এবং সেই অর্থের বিভিন্ন খাতে ব্যয় সংক্রান্ত বিষয়গুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন।

অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের জাতীয় সভাপতি এবং অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি অধ্যাপক নারায়ণ লাল গুপ্ত তাঁর বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্র গঠনের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি গুরু পরম্পরার প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে এক প্রেরণামূলক ও উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন এবং সংগঠনের মূলমন্ত্র— “রাষ্ট্রের হিতে শিক্ষা, শিক্ষার হিতে শিক্ষক এবং শিক্ষকের হিতে সমাজ”—এর তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের নামের মধ্যেই রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষকসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতিফলন রয়েছে। তিনি আরও জানান, সারা দেশে বিভিন্ন স্তরে ১৫ লক্ষেরও বেশি শিক্ষক এই সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছেন, যা সংগঠনের ব্যাপক বিস্তার ও শক্তির পরিচায়ক।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ত্রিপুরা প্রান্তের প্রান্ত প্রচারক নিখিল শঙ্কর নিওয়াসকর তাঁর বক্তব্যে দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ভারতকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের শক্তি ও সামর্থ্যকে চিনে নিতে হবে। তিনি ভারতের সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি, জ্ঞান পরম্পরা, প্রতিভা এবং প্রাচীন প্রজ্ঞার গুরুত্ব তুলে ধরেন। সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ভারতকে বিশ্বগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তিনি সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্য শিক্ষক সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।পাশাপাশি, সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলির ইতিবাচক মোকাবিলা করে সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের জন্য শিক্ষকদের আহ্বান জানান।

অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ, ত্রিপুরা প্রান্তের সভাপতি তীর্থরাম রিয়াং সভাপতির ভাষণে ত্রিপুরায় সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ন্যায্য আর্থিক ও চাকরিসংক্রান্ত স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার জন্য সংগঠনের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন। তিনি মহার্ঘ ভাতা (ডিএ), বাড়িভাড়া ভাতা (এইচআরএ) এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য ত্রিপুরা সরকারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। ত্রিপুরার শিক্ষকসমাজের কল্যাণ এবং শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নয়নে সংগঠনের নিরন্তর প্রচেষ্টার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

বার্ষিক সাধারণ সভার দ্বিতীয় অধিবেশনে অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের জাতীয় সভাপতি অধ্যাপক নারায়ণ লাল গুপ্তের পাশাপাশি সংগঠনের ত্রিপুরা প্রান্তের সংগঠনমন্ত্রী ধীরেন্দ্র দেবনাথ এবং দেবাশিস রায় চৌধুরী, তীর্থরাম রিয়াং উপস্থিত ছিলেন।

এই অধিবেশনে দেবাশিস রায় চৌধুরী শিক্ষকসমাজের বিভিন্ন সমস্যা, দাবি ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে ২৭ দফা দাবি সনদ উপস্থাপন করেন। অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের জাতীয় সভাপতি এবং অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি অধ্যাপক নারায়ণ লাল গুপ্ত একটি বৌদ্ধিক প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল বিকশিত ভারত গঠনের স্বপ্ন, ভারতকে বিশ্বগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্পে শিক্ষক্ষমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ভারতীয় পরম্পরায় কর্তব্যবোধের গুরুত্ব ; ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানব্যবস্থার প্রতি আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা। তিনি মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ ভারত গঠনে নতুন শিক্ষানীতির প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্বও ব্যাখ্যা করেন। জাতীয় সঙ্গীত এবং জাতীয় গানের তাৎপর্য তুলে ধরে “বন্দে মাতরম্” গানের প্রাসঙ্গিকতা এবং বিকশিত ভারতের স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তিনি শিক্ষকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আন্তঃবিষয়ক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হতে, নিজেদের জ্ঞান ও গবেষণার পরিধি বিস্তৃত করতে এবং ভারতীয় ঐতিহ্য – বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের আদর্শকে শক্তিশালী করতে উৎসাহিত করেন। পাশাপাশি, ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও ভাষার ভিন্নতা নির্বিশেষে সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে রামঠাকুর মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মৌশম ভট্টাচার্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এরপর সমবেতভাবে জাতীয় গান পরিবেশনের মাধ্যমে সাধারণ সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *