আগরতলা, ১৩ অক্টোবর।।

রাজ্য মন্ত্রিসভা এক সর্বসম্মত প্রস্তাবের মাধ্যমে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত—টানা ২৫ বছর ধরে সরকার প্রধান হিসেবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়েছে বলে আজ জানিয়েছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।

মুখ্যমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন যে, প্রধানমন্ত্রীর এই সুদীর্ঘ জনসেবার যাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’-এর ভাবনাকে ত্বরান্বিত করতে রাজ্যের আটটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘সেবা জ্যোতি চক’ নামকরণের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মহাকরণে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা বলেন, রাষ্ট্রগঠন, সুশাসন, জাতীয় নিরাপত্তা, জনকল্যাণ এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর অনবদ্য অবদানকে এই প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ত্রিপুরার ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষের পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ ও ‘বিকশিত ত্রিপুরা’র স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাজ্য সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।”

এদিন মুখ্যমন্ত্রী ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের ২৬ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদির গৌরবময় যাত্রার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর শাসনব্যবস্থায় সর্বদা ‘রাষ্ট্র প্রথম’ এবং ‘নাগরিক প্রথম’ – এই নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনকে করা হয়েছে জনসেবামুখী।

ডাঃ সাহা বলেন, “বিশেষ করে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতির মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারকে সমাদৃত করেছে মন্ত্রিসভা। এর পাশাপাশি সমাজের সবচেয়ে সুবিধা বঞ্চিত অংশের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, জন অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সুশাসনের ভিত মজবুত করার প্রয়াসকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে।” প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গৃহীত বেশ কিছু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ৩৭০ ধারা বিলোপ, ‘ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ চালু, চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ পদ সৃষ্টি, শ্রম আইন সংস্কার এবং ঔপনিবেশিক আমলের ফৌজদারি আইনের পরিবর্তন এর অন্যতম। দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, ২০১৯ সালের বালাকোট বিমান হামলা এবং ২০২৫ সালের মে মাসের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মতো বলিষ্ঠ জবাবের কথাও এতে স্থান পেয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এছাড়া, ২০২৩ সালে সফলভাবে জি-২০ (G20) সম্মেলন আয়োজন, ব্রিকস (BRICS)-এ ভারতের সক্রিয় ভূমিকা এবং বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও বিদেশী সংসদে ভাষণ দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। তিনি জানান, কেন্দ্রের নানা উন্নয়নমূলক উদ্যোগের ফলে ত্রিপুরা কীভাবে উপকৃত হয়েছে, তাও মন্ত্রিসভার আলোচনায় উঠে এসেছে—বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো ও নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রে।

ডাঃ সাহা বলেন, “প্রধান প্রধান সড়ক পরিকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে আগরতলা সিটি ওয়েস্ট বাইপাসের কাজ শুরু এবং আগরতলা-চোরাইবাড়ি ও আগরতলা-উদয়পুর করিডোরকে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা। দ্রুত জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি শিফটিং এবং বনদপ্তরের ছাড়পত্র দেওয়ার মাধ্যমে রাজ্য সরকার এই প্রকল্পগুলিতে সহযোগিতা করছে। রেল যোগাযোগেও বড় অগ্রগতি হয়েছে; উদয়পুর-আগরতলা-সাব্রুম রেল করিডোর সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত করা হয়েছে। অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের অধীনে ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ধর্মনগর, কুমারঘাট, উদয়পুর ও আগরতলা রেল স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। এই আধুনিকীকরণের ফলে আধুনিক যাত্রী প্রতীক্ষালয়, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য উন্নত সুবিধা এবং ডিজিটাল তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে।”

মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা আরও জানান, চন্দ্রনাথপুর থেকে সাব্রুম পর্যন্ত ২৬৩ কিলোমিটার রেললাইন ডাবল করার সমীক্ষার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। ত্রিপুরার ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রিসভা ২০১৮ সালে আগরতলা বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে ‘মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর’ করার বিষয়টি স্মরণ করে। এছাড়া, আগরতলা স্মার্ট সিটি মিশনের অধীনে স্মার্ট রোড, আধুনিক সংযোগকারী পথ, নদী ও জলাশয় পুনরুজ্জীবন, ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফুটপাত এবং এলইডি স্ট্রিট লাইটের মতো নগর উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রের অগ্রগতির কথা বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী একটি আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, স্মৃতিচারণের অংশ হিসেবে রাজ্যের চিহ্নিত আটটি স্থানে স্থায়ীভাবে ‘সেবা জ্যোতি’ স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সেবা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যকে জনসাধারণের মাঝে স্থায়ী প্রতীক হিসেবে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই সেবা জ্যোতি চকগুলি জনপ্রেরণা ও সামাজিক অংশগ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। এগুলি পরিচ্ছন্নতা অভিযান, স্বেচ্ছাসেবী কাজকর্ম ও বৃক্ষরোপণের মতো কাজকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্প সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াবে, যাতে প্রকল্পের সুবিধা সমাজের অন্তিম ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়।

এই অনুমোদিত আটটি স্থানের মধ্যে রয়েছে – পশ্চিম ত্রিপুরা: রানীরপুকুর সংলগ্ন জংশন, সোনারতরী স্টেট গেস্ট হাউস এবং শহীদ ভগত সিং যুব আবাসন এলাকা। উত্তর ত্রিপুরায় ধর্মনগরের ডিএনবি প্লেগ্রাউন্ড ট্রাই-জংশন। উনকোটি জেলায় কৈলাশহরের শ্রীরামপুর ব্রিজ চৌমুহনী। ধলাই জেলায় আমবাসা টাউন হল সংলগ্ন এলাকা। খোয়াই জেলায় মহাদেব টিলার নিকটবর্তী স্থান। সিপাহীজলা জেলায় বিশ্রামগঞ্জ মোটর স্ট্যান্ডের কাছে জংশন। গোমতী ও দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলায় উদয়পুরের জগন্নাথ দীঘির কোণে জানতলা ক্রসিং এবং দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়ায় কৃষি উপ-অধিকর্তার কার্যালয়ের নিকটবর্তী এলাকা।

মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগ গ্রামীণ ও শহরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন সুদৃঢ় করবে এবং সামাজিক ও জাতীয় উন্নয়নে নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *