এবার সারা দেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যেও ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপের কথা বলা হয়েছে।
#সমীরণ রায়#
___________________
ঢাকা ডেস্ক,৮ অক্টোবর।।
সনাতন ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎস দরজায় কড়া নাড়ছে। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উৎসবের আমেজ। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই বিভিন্ন পূজামণ্ডপে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও বাঁশ ও খড়ের কাঠামোর ওপর দেবী দূর্গার রূপ ফুটিয়ে তুলতে চলছে মাটির শেষ প্রলেপ। কোথাও চলছে প্রতিমার মুখাবয়ব ও অলংকারের সূক্ষ্ম কাজ। আবার কোনো কোনো মণ্ডপে শুরু হয়েছে রং-তুলির কাজ। দিন-রাত পরিশ্রম করে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিচ্ছেন মৃতশিল্পীরা। এতে করে মাটির অবয়বে ফুটে উঠছে দেবী দূর্গার প্রাণের স্পর্শ। সঙ্গত কারণে, রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মৃতশিল্পীদের কাছে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার লড়াই। তাদের হাতের মাটিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। মাটির শেষ আঁচড়, রং-তুলির নিখুঁত টান আর অলংকারের সাজে প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলতে রাত-দিন কাজ করছেন তারা। আর তাদের সেই শ্রমেই কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানীর শত শত মণ্ডপে প্রাণ পাবে দেবী দুর্গার প্রতিমা।জাতীয় মন্দির শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালি মন্দির, বনানী, উত্তরা, বরদেশ্বীর কালি মন্দির, রাম কৃষ্ণ মিশন, পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মাটির কাজ শেষ করে এখন প্রতিমার গায়ে রং, শাড়ি, গহনা ও অন্যান্য সাজসজ্জার কাজ চলছে।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার ১০ অক্টোবর মহালয়া দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী শেষে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের মূল দুর্গোৎসব। এবার সারা দেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যেও ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপের কথা বলা হয়েছে।

পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা বলছেন, মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কারিগরদের পারিশ্রমিক, মাটিসহ কাঁচামাল, ঢাক-ঢোল ও সাজসজ্জার ব্যয়ও বেড়েছে। তারপরও নতুন নতুন এলাকায় পূজার আয়োজন বাড়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। গত কয়েক বছরের তুলনায় মাটি, খড়, বাঁশ, রং, কাপড়, অলংকারসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে প্রতিমা তৈরির খরচও বেড়েছে। তবে সরকার পূজার বরাদ্দ ও ছুটি বাড়িয়েছে, এটিও উৎসবের পরিবেশকে আরও ইতিবাচক করেছে।
রমনা কালি মন্দির ও শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমা তৈরির শুরুতে বাঁশ ও খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এরপর কয়েক ধাপে মাটি দিয়ে সেই কাঠামোকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষে শুকানোর পর রং ও সাজসজ্জার কাজ করা হচ্ছে। এরমধ্যে দিয়ে কয়েকজন মৃতশিল্পী প্রতিমার মুখাবয়ব ও শরীরের বিভিন্ন অংশে মাটির শেষ প্রলেপ দিচ্ছেন। কেউ হাতে তুলে নিচ্ছেন সূক্ষ্ম যন্ত্র, কেউ আবার প্রতিমার চোখ, নাক, ঠোঁট ও আঙুলের নিখুঁত গড়ন ফুটিয়ে তুলছেন।
এদিকে, মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ায় নিরাপত্তা নিয়েও জোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সমন্বয় সভার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পূজাকে কেন্দ্র করে জাতীয়, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইঝঝ মণ্ডপগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা থানায় জমা দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা, জেনারেটর প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, দুর্গাপূজা এখন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করেছে। সরকার পূজার বরাদ্দ ও ছুটি বাড়িয়েছে, এটিও উৎসবের পরিবেশকে আরও ইতিবাচক করেছে। পূজার মূল চেতনা হলো অসাম্প্রদায়িকতা, সম্প্রীতি ও শান্তি। তাই মণ্ডপে মণ্ডপে পূজার আয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও জরুরি। দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার নয়, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও একটি বড় প্রতীক। আমরা চাই নির্বিঘ্নে পূজা করতে। একই সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবটি সার্বজনীন রূপ পাক।
শ্রীশ্রী রমনা কালী মন্দির শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক অপর্ণা রায় দাস বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি আমাদের প্রায় শেষ। মূর্তি তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে মন্ডপের কাজও চলছে। আলোকসজ্জার কাজ চলছে। আগামী ১০ অক্টোবর ভোরে মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনী উৎসব শুরু হবে। এরমধ্যেই আমাদের আনুষঙ্গিক কাজগুলো সেরে ফেলতে পারবো।

