অব্যবস্থাপনার কারণে গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব টিকা প্রদানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকা ও সমন্বয়হীনতার ফলে ২৬টি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
*সমীরণ রায়*
_____________
ঢাকা, ১৯এপ্রিল।।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে টিকা অব্যবস্থাপনা দেশব্যাপী রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১১টি রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু টিকার সংকট তৈরি হয়। এতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। পাশাপাশি ১৫টি রোগের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সংক্রামক ও অসংক্রামক মিলিয়ে অন্তত ২৬টি রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের বিভিন্ন বয়সে মোট সাতটি টিকা দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে ১১ ধরনের রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। যেমন-যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা, নিউমোনিয়া থেকে সুরক্ষায় পিসিভি, হাম ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণে এমআর টিকা, টাইফয়েড প্রতিরোধে টিসিভি এবং রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়া প্রতিরোধে ওরাল ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস (হুপিং কাশি), ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি ও হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে পেন্টাভ্যালেন্ট (পেন্টা) টিকা দেওয়া হয়, যা পাঁচটি রোগ প্রতিরোধে কার্যকর। পোলিও নির্মূলে ব্যবহৃত হয় দুই ধরনের টিকা-মুখে খাওয়ার ওপিভি এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে আইপিভি।
অভিযোগ রয়েছে, অব্যবস্থাপনার কারণে গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব টিকা প্রদানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকা ও সমন্বয়হীনতার ফলে ২৬টি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) ১৯৯৮ সাল থেকে দেশে রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে এই কর্মসূচির আওতায় রোগ নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও গবেষণাসহ ৩৮টি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হতো।
২০২৪ সালের জুনে চতুর্থ এইচপিএনএসপি শেষ হয়। পরের মাসে পঞ্চম কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, গত বছরের মার্চে হঠাৎ ওপি বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত দুই বছরে মাত্র পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন হয়েছে। এতে রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। ওপি বন্ধ থাকায় হাম-রুবেলা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, হেপাটাইটিস, অ্যানিমিয়া, কালাজ্বর, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, টাইফয়েড, পোলিও, এইচআইভি, ডিপথেরিয়া, নিউমোনিয়াসহ ২৬টি রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব, অপুষ্টি এবং শিশুমৃত্যুর হার বাড়তে শুরু করেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওপি বন্ধের প্রভাব পড়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-তেও। আগে গ্যাভির সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা হতো, যা তুলনামূলক দ্রুত ও কম জটিল ছিল। কিন্তু হঠাৎ এ পদ্ধতি বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজস্বভাবে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি তৈরি হয়।
পরে আবার ইউনিসেফকে যুক্ত করা হলেও এ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকার পূর্ণ বা আংশিক ডোজ পায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেশে হামের বিস্তার দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

