#সমীরণ রায়#
______________
ঢাকা ডেস্ক, ১১ আগস্ট।।
মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সারতে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফিরিয়ে দিতেও আর্জি জানানো হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে এসব অনুরোধ জানানো হয় বলে জানিয়েছেন সরকারপ্রধানের উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন। তিনি বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হত্যাকারীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়। ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ঢাকা বারবার তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে।
আর গত বছরের ডিসেম্বরে গুলিতে ওসমান হাদি নিহত হওয়ার আড়াই মাস বাদ প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেন ধরা পড়েন পশ্চিমবঙ্গে। এরপর থেকে তাদের ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ।
সোমবার বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সাক্ষাতের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
উপ প্রেস সচিব স্বাধীন বলেন, দুই দেশের দ্বি-পাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দুই দেশের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ভারতের নতুন হাই কমিশনারকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী। ঢাকায় গেল দুই মাসের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন ত্রিবেদী।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাই কমিশনারের বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পরে মন্ত্রণালয়ে ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করার বিষয়ে বিষয়টি উঠে এসেছে এবং আমরা তাদেরকে বলেছি এই প্রত্যর্পণ প্রসেস ত্বরান্বিত করার জন্য। আমরা আশা করি ভারত এ ব্যাপারে পজিটিভ সাড়া দেবে। এছাড়া শহীদ হাদীর সাসপেক্টেড হত্যাকারীরা আপনারা জানেন ধরা পড়েছে। আমরা ভারত যে সমস্ত কাগজপত্র চেয়েছিল সবই তাদেরকে দিয়েছি। এই বিষয়টা এসেছে। আমাদের জন্য এটাও তো অত্যন্ত একটা সেনসিটিভ বিষয়। এবং আমরা বলেছি এই হত্যাকারীদেরকে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করার জন্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট দরকার, সেই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ৫ অগাস্টের ব্যাপারে আমাদের যে পজিশন, আমরা ক্লিয়ারলি বলে দিয়েছি।
এছাড়া সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের অফিসকক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ নানাদিক থেকে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অতীতকে পেছনে ফেলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা বা ফ্রেশ স্টার্ট জরুরি। দু’দেশের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য বা ইস্যু রয়েছে যেগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সমতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে ভারতকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক আলোচনা হয়। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আমরা কেবল ভৌগোলিক সীমানা ভাগাভাগি করি না, আমরা সমৃদ্ধির স্বপ্নও ভাগাভাগি করি।” গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ইস্যুতে চ্যালেঞ্জ থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইস্যু থাকাটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য; ইস্যু না থাকলে সেটা প্রকৃত গণতন্ত্র হতে পারে না। তবে সকল চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে দুই দেশের জনগণের একটাই মূল প্রত্যাশা, তা হলো একটি সুদৃঢ় ও চমৎকার সম্পর্ক, যা উভয় পক্ষের জন্য কল্যাণকর পরিবেশ তৈরি করবে। হাইকমিশনার আরও বলেন, আলোচনা ও কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করা যাবে না, দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো জটিল ইস্যু নেই। তিনি আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় ও উজ্জ্বল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে মন্ত্রী বিদ্যমান বন্দি বিনিময় ও এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত সব চিহ্নিত পলাতক অপরাধীকে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করার লক্ষ্যে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতীয় হাইকমিশনারকে অনুরোধ জানান। তাছাড়া শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ভারত থেকে এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী যথাশীঘ্র সম্ভব বাংলাদেশে ফেরত প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়। হাইকমিশনার ভারতের পক্ষ থেকে আইনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান।

