ডেস্ক রিপোর্টার,৪ নভেম্বর।।
পাহাড়ের রাজনীতিতে এক বিরাট মোড়! গঠিত হলো তিপ্রা মথার সর্বোচ্চ স্তরের সাংগঠনিক কাঠামো—‘কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটি’ বা CWC। বিকে রাংখল, জগদীশ দেববর্মা, বৃষকেতু দেববর্মা, রনজিৎ দেববর্মা, পূর্ণচন্দ্র জমাতিয়া, কেনারাম রিয়াং, পল ডানসু এবং রতিশ ত্রিপুরাদের মতো বর্ষীয়ান ও শীর্ষ নেতাদের নিয়ে তৈরি এই শক্তিশালী কমিটি। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক? পুরো দল অনড় থাকা সত্ত্বেও এই তালিকায় নিজের নাম রাখতে স্পষ্ট অস্বীকার করেছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা তথা তিপ্রা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মা!
২০২১ সালে এডিসি নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে প্রদ্যোত কিশোরের হাত ধরে যে ‘তিপ্রা মথা’র জন্ম, আজ বলা চলে সেই দল একপ্রকারের ‘প্রদ্যোত-হীন’! কিন্তু প্রশ্ন হলো—’মহারাজা’র এই রাজনৈতিক সন্ন্যাস বা দূরত্ব তৈরি তিপ্রা মথা, পাহাড় এবং সামগ্রিক রাজ্য রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে ?

তিপ্রা মথার সাংগঠনিক শক্তিতে কি প্রভাব পড়তে পারে?
প্রদ্যোত কিশোর কেবল তিপ্রা মথার সভানেপতি বা প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন দলের মূল চালিকাশক্তি ও ‘ব্র্যান্ড’। প্রদ্যোতহীন তিপ্রা মথাকে এখন সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও যৌথ নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করতে হবে। CWC-তে অভিজ্ঞ নেতারা থাকলেও, সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের একত্রিত রাখা এবং দলীয় কোন্দল সামলানো নতুন কমিটির জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে। নেতৃত্বের এই শূন্যতা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও গতিতে সাময়িক ধাক্কা দিতেই পারে।
পাহাড়ের রাজনীতিতে রাজনৈতিক কি প্রভাব পড়তে পারে?
পাহাড়ের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক এবং আঞ্চলিক আবেগের ওপর ভিত্তি করে চলেছে। প্রদ্যোত কিশোরের অনুপস্থিতি পাহাড়ে একটি রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি করবে। আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে প্রভাব বিস্তারের যে ভারসাম্য ছিল, তা নতুন করে দোলাচল তৈরি করতে পারে।

সমগ্র রাজ্য রাজনীতিতে এর কি প্রভাব পড়তে পারে?
রাজ্য বিধানসভা ও প্রশাসনিক রাজনীতিতে তিপ্রা মথা ছিল এক নির্ণায়ক শক্তি। প্রদ্যোত কিশোর সরাসরি নীতি নির্ধারণ না করলে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে বকেয়া চুক্তি বাস্তবায়ন বা আলোচনার দরকষাকষির ক্ষমতা কতটা বজায় থাকবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্ৰদ্যুতের কিশোরের এই সিদ্ধান্তে প্রধান শাসকদল বিজেপির কি লাভ হবে?
অবশ্যই। প্রদ্যোতের মতো একক প্রভাবশালী ও ক্যারিশম্যাটিক নেতার অনুপস্থিতি শাসকদল বিজেপির জন্য পাহাড়ে জমি শক্ত করার এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিল। আঞ্চলিক আবেগে যে ফাটল তৈরি হতে পারে, তাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি পাহাড়ে নিজেদের সাংগঠনিক বিস্তার বাড়াতে এবং তিপ্রা মথার অসন্তুষ্ট ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টানতে সচেষ্ট হবে।

বামপন্থীদের কি ঘুরে দাঁড়ানোর চান্স রয়েছে?
ইতিহাস বলছে—২০২১ সালের এডিসি নির্বাচন, ২০২৩-এর বিধানসভা, ২০২৬-এর এডিসি এবং সদ্য সমাপ্ত ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে প্রদ্যোত কিশোরের একক জনপ্রিয়তার কারণেই পাহাড়ে বামেদের যে ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক ছিল, তা ধসে পড়েছিল। পাহাড়ে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছিল বামেরা।
এখন প্রদ্যোতের রাজনীতি থেকে বিরতি বা সন্ন্যাসের ঘোষণায় পাহাড়ে একটি বিরল রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হলো বামেদের সামনে। বিশেষ করে জনজাতিদের আদি রাজনৈতিক ভিত্তি যদি তিপ্রা মথার প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে আস্থাহীনতায় ভোগে, তবে বামেরা তাদের ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন নিয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর এবং হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাতে পারে।
রাজনীতিতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, আর ফাঁকা স্থানও বেশি দিন ফাঁকা থাকে না।
রাজনীতিতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, আর ফাঁকা স্থানও বেশি দিন ফাঁকা থাকে না। CWC তিপ্রা মথার রাশ কতটা শক্ত হাতে ধরে রাখতে পারে, আর মহারাজার এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ত্রিপুরাকে কোন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে নিয়ে যায়—সেটাই এখন দেখার।

