গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার অনেক বেশি ( সাধারণ ক্ষুদ্র ঋণে ২০ শতাংশের মত); তাই এই হার কমিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে কেন সমন্বয় করা হবে না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না–রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
।।সমীরণ রায়।।
______________
ঢাকা ডেস্ক , ১৯ মে।।
গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়েছে হাই কোর্ট। ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন।
সোমবার জনস্বার্থে’ দায়ের করা এক রিট মামলার প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের বেঞ্চ এই রুল জারি করে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রাক্তন
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইউনূসকেও এ মামলায় বিবাদী করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর ফাঁকিসহ একাধিক অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে সেখানে। আদালতে রিটকারী পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাসুদ আর সোবহান ও ফাতেমা চৌধুরী।
আইনজীবী ফাতেমা বলেন, রিটটি গত সপ্তাহে করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির কারণে তাদের বক্তব্য শুনতে হয়েছে। শুনানি শেষে আদালত আজ আদেশ দিয়েছে। আদালত আমাদের দুটি আবেদনের ওপর রুল দিয়েছে। প্রথমত, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার অনেক বেশি ( সাধারণ ক্ষুদ্র ঋণে ২০ শতাংশের মত); তাই এই হার কমিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে কেন সমন্বয় করা হবে না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না–রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশে কেউ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে ৩০০ টাকা পরিশোধ করলে তাকে ঋণ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক আইনে এমন কোনো সুবিধা নেই। ফলে ভূমিহীনরা যারা ঋণ নেন, তারা বছরের পর বছর কেবল পরিশোধই করতে থাকেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রেও যেন ওই সুবিধা দেওয়া হয়, রুলে সেটাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
মামলায় কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়া হয়নি জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, আবেদনে থাকলেও আমরা শুনানিতে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাইনি। তাই আদালত কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেয়নি।
রিট আবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংক ভূমিহীন ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রবর্তিত মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচির আওতায় যে সুদের হার আরোপ করে, তা নির্ধারিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের তুলনায় ‘অত্যন্ত বেশি ও শোষণমূলক। এই সুদের হার কমানোর জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনে মোট চারজনকে বিবাদী করা হয়েছে। তারা হলেন –বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
দেশের প্রান্তিক ও দারিদ্র্য পীড়িত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের জন্য জামানত ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের উদ্দেশ্যে ১৯৮৩ সালে ‘গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ এর মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংক গঠন করা হয়।
পরে অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০১৩ সালে ‘গ্রামীণ ব্যাংক আইন’ প্রণয়ন করা হয়। সেই আইনেই ব্যাংকটি পরিচালিত হচ্ছিল। পরে ইউনূস সরকারপ্রধান থাকা অবস্থায় ২০২৫ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব কমিয়ে গ্রাহক বা উপকারভোগীর ক্ষমতা বাড়িয়ে আইন সংশোধনের অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দীর্ঘ ২৮ বছর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনের চেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ও মুহাম্মদ ইউনূসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাবকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে ইউনূসের নেতৃত্বেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। রিটকারী আইনজীবী মাসুদ আর সোবহান তার আবেদনে সুদের হারের মূল অভিযোগের পাশাপাশি মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন। পদের মেয়াদ লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বলা হয়েছে, অধ্যাদেশ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়াদ ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে ‘প্রভাবিত করে’ ইউনূস ‘বেআইনিভাবে’ আরও ৫ বছরের জন্য নিয়োগ পান। তিনি ৬৫ বছরের বেশি বয়সেও আরেক মেয়াদের জন্য নিয়োগ দাবি করেছিলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করলে তিনি হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ে হেরে যান। এরপর থেকে তিনি ‘পরামর্শক’ হিসেবে ব্যাংকটির ‘নীতি নির্ধারণ করছেন’ বলে রিটকারীর ভাষ্য। এছাড়া ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘কর ফাঁকির চেষ্টা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের’ অভিযোগও আনা হয়েছে এই রিট মামলায়।
সেখানে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের ‘বিপুল মুনাফা’ দিয়ে ইউনূস একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেন, যার ট্রাস্টিরা তার ‘ঘনিষ্ঠ আত্মীয়’। তিনি এই ফান্ডের অর্থের ওপর আয়কর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তা আদায় করে।
রিট আবেদনে ‘গুরুতর অভিযোগ’ হিসেবে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত ৬৭৭ কোটি টাকা (৫৫ মিলিয়ন ডলার) আয়কর ২০২৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হঠাৎ করে সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেয়, যার কোনো ‘আইনি ভিত্তি ছিল না’।
পিটিশনে দাবি করা হয়, ইউনূসকে ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই’ ফৌজদারি আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। জামিন পাওয়ার পর তিনি দেশত্যাগ করে প্যারিসে যান এবং ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ অগাস্ট দেশে ফিরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে তার সেই রায় বাতিল করা হয়।

