ত্রিপুরার রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ বাম শাসনের সময় এসপিওদের ব্যবহার করা হয়েছে “অস্থায়ী কর্মী” হিসেবে। বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্থায়ী নীতি গড়ে ওঠেনি। এরপর ২০১৮ সালে সরকার পরিবর্তনের সময় রাজ্যের হাজার হাজার এসপিও পরিবার আশায় বুক বেঁধেছিল। নির্বাচনী সভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মঞ্চে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—ক্ষমতায় এলে এসপিওদের নিয়মিত করা হবে, বেতন বৃদ্ধি করা হবে, তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

ডেস্ক রিপোর্টার, ১৪ মে।।
     ত্রিপুরা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা কর্মীদের মধ্যে অন্যতম এসপিও (Special Police Officer) জওয়ানরা। রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর, থানা থেকে আউট পোস্ট, নির্বাচন থেকে দাঙ্গা পরিস্থিতি, রাতের টহল থেকে অপরাধী ধরার অভিযান—সব জায়গাতেই পুলিশের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে চলেছেন এই এসপিও জওয়ানরা।
   কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে—যে মানুষগুলো নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রেখে রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন, তাঁদের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কি সরকারের নেই?

Table of Contents


      

এরপর ২০১৮ সালে সরকার পরিবর্তনের সময় রাজ্যের হাজার হাজার এসপিও পরিবার আশায় বুক বেঁধেছিল।

ত্রিপুরার রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ বাম শাসনের সময় এসপিওদের ব্যবহার করা হয়েছে “অস্থায়ী কর্মী” হিসেবে। বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্থায়ী নীতি গড়ে ওঠেনি। এরপর ২০১৮ সালে সরকার পরিবর্তনের সময় রাজ্যের হাজার হাজার এসপিও পরিবার আশায় বুক বেঁধেছিল। নির্বাচনী সভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মঞ্চে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—ক্ষমতায় এলে এসপিওদের নিয়মিত করা হবে, বেতন বৃদ্ধি করা হবে, তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।


কিন্তু আজ বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো।
গত আট বছরে ডাবল-ইঞ্জিন, পরে ত্রি-ইঞ্জিন সরকারের আমলেও এসপিওদের ভাগ্যের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বরং অভিযোগ উঠছে, তাঁদের দিয়ে পুলিশের প্রায় সমস্ত দায়িত্ব পালন করানো হলেও ন্যায্য সম্মান, বেতন ও নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি।


বর্তমানে একজন এসপিওকে  অফিসারদের ব্যক্তিগত কাজও করতে হয়—অফিসারের বাড়ির কাজ, কাপড় কাচা, রান্নাবান্না, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ও ফিরিয়ে আনা পর্যন্ত।

বর্তমানে একজন এসপিওকে শুধু থানার দায়িত্ব নয়, অনেক ক্ষেত্রে অফিসারদের ব্যক্তিগত কাজও করতে হয়—অফিসারের বাড়ির কাজ, কাপড় কাচা, রান্নাবান্না, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ও ফিরিয়ে আনা পর্যন্ত। অথচ মাস শেষে হাতে আসে মাত্র প্রায় ১২ হাজার টাকার মতো সামান্য ভাতা, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে একটি পরিবারের ন্যূনতম খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব।
    এদিকে মন্ত্রী-নেতাদের গাড়ির তেলের খরচ, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার পিছনে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা ব্যয় হলেও, যারা বাস্তবে মাটিতে নেমে নিরাপত্তা দিচ্ছেন সেই এসপিওদের ভবিষ্যৎ আজও অন্ধকারে।সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—ডিউটি চলাকালীন বা কর্তব্য পালন শেষে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও বহু ক্ষেত্রে মৃত এসপিও পরিবারের হাতে পৌঁছায় না উল্লেখযোগ্য সরকারি সাহায্য।

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ এডিসি নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে গন্ডাছড়া থানায় ফেরার পথে বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান ধলাই জেলার রথপাড়ার বাসিন্দা এসপিও অজেন্দ্র ত্রিপুরা।

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ এডিসি নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে গন্ডাছড়া থানায় ফেরার পথে বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান ধলাই জেলার রথপাড়ার বাসিন্দা এসপিও অজেন্দ্র ত্রিপুরা। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেও তাঁর পরিবার আজও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ উঠেছে।
   অবশেষে সহকর্মীরাই নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে কিছু আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেন মৃত জওয়ানের পরিবারের হাতে। উপস্থিত ছিলেন এসপিও সংগঠনের নেতৃত্বে অবনি শীল, ইন্দ্র মনি, দীপঙ্কর দাস, হীরা মোহন দেবনাথ সহ বহু সহকর্মী।
  

মৃত এসপিও অজেন্দ্র ত্রিপুরার অসহায় পরিবার।

মৃত এসপিও জওয়ানের স্ত্রী আবেগঘন বক্তব্যে জানান—২০ বছর সরকারের অধীনে কাজ করার পরও তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পরে পরিবারকে ন্যূনতম নিরাপত্তা বা সহায়তা দেয়নি সরকার।

মৃত এসপিও জওয়ানের স্ত্রী আবেগঘন বক্তব্যে জানান—২০ বছর সরকারের অধীনে কাজ করার পরও তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পরে পরিবারকে ন্যূনতম নিরাপত্তা বা সহায়তা দেয়নি সরকার। চারজনের সংসার চালাতে এখন তাঁকে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
    অন্যদিকে এসপিও সংগঠনের দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩৭ জন এসপিও বিভিন্ন কারণে মারা গেছেন। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশ পরিবারের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়ায়নি কোনো সরকারই।
   প্রশ্ন উঠছে—যে বাহিনী ছাড়া বর্তমানে অনেক থানা ও আউট পোস্ট পরিচালনা কার্যত অসম্ভব, সেই বাহিনীর কর্মীদের কেন এখনও স্থায়ী মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না? কেন তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, বীমা, পেনশন বা মৃত্যুকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না?
     

মৃত অজেন্দ্র ত্রিপুরার রান্না ঘরের চিত্র।

ক্ষমতায় থাকাকালীন সব সরকারই এসপিওদের ব্যবহার করেছে ভোট ও প্রশাসনিক স্বার্থে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ক্ষমতায় থাকাকালীন সব সরকারই এসপিওদের ব্যবহার করেছে ভোট ও প্রশাসনিক স্বার্থে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের দাবি ও সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে উপেক্ষিত হয়েছে।
আজ সময় এসেছে এসপিওদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার। কারণ তাঁরা শুধু “অস্থায়ী কর্মী” নন—তাঁরাও কারও বাবা, স্বামী, সন্তান ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মানুষ।
   

মৃত  অজেন্দ্র ত্রিপুরার বাড়িতে এসপিও নেতৃত্ব।

বাস্তবে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হতে থাকবে হাজার হাজার এসপিও পরিবার।

ত্রিপুরার জনগণের একাংশ মনে করছেন, যদি সত্যিই “সুশাসন” ও “ডাবল ইঞ্জিন উন্নয়ন” বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে প্রথমে মাটিতে কাজ করা এই এসপিওদের ন্যায্য অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।নতুবা প্রতিশ্রুতি শুধু রাজনৈতিক ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর বাস্তবে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হতে থাকবে হাজার হাজার এসপিও পরিবার।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *