উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদের দৈনন্দিন কর্মজীবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন মানসিক চাপ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু অনুরাগ ধ্যানকরের আত্মহত্যার পেছনে কি রাজনৈতিক বা কর্মক্ষেত্রের চাপ? নাকি নেপথ্যে কোনো ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা মানসিক অবসাদ ছিল? তা ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণের পরই পরিষ্কার হবে।
ডেস্ক রিপোর্টার, ২৩ জুলাই।।
রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ পদাধিকারী, অর্থাৎ ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ অনুরাগ ধ্যানকরের আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যু রাজ্য রাজনীতিতে এক তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিগত ২০ জুলাই আগরতলাস্থিত পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে তাঁর নিজস্ব চেম্বারের সংলগ্ন শৌচাগার থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। জিবিপি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পরপরই রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে উঠেছে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি এবং প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান কতটা?
ডিজিপির মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই সিপিআই(এম),কংগ্রেস সহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরব হয়েছে। বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার হাসপাতাল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার তদারকি করে তদন্তের দাবি করেছেন।
বিরোধী নেতৃত্বের অভিযোগ,বিগত কয়েক বছরে রাজ্যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, অনুরাগ ধ্যানকরের মতো একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং দক্ষ আইপিএস অফিসারকেও এই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে।

বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, যিনি সিবিআই, বিএসএফ এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, শুধু তাই নয় নীরব মোদীর আর্থিক ঘটালার মামলার তদন্তও তিনি করেছিলেন। এরকম একজন দক্ষ আইপিএস হঠাৎ আত্মহত্যা করবেন?—তা মেনে নেওয়া কঠিন। তাই হাই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির অধীনে উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি তুলেছে সিপিআই(এম)।
বামেদের দেখানো পথেই হাইকোর্টের বিচারপতিকে দিয়ে ডিজিপির মৃত্যুর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন।
অনুরাগ ধ্যানকরের ঘনিষ্ঠ স্বজনরা বলছেন, ” তাঁর মতো একজন জাঁদরেল অফিসার আত্মহত্যা করতেই পারেন না।”
আইপিএস অনুরাগ ধ্যানকরের মৃত্যু ইস্যুতে প্রদেশ বিজেপি সভাপতি বিধায়ক অভিষেক দেবরায়ের বক্তব্য, বিরোধী দলগুলি নিছক একটি মৃত্যুর ঘটনাকে নিয়ে রাজনৈতিক করণের চেষ্টা করছে।
তবে বাস্তবে পরিস্থিতি ঠিক কী? রাজনৈতিক অভিযোগের বাইরে এসে যদি প্রশাসনিক ও তদন্তকারী সূত্রের দিকে নজর দেওয়া হয়, তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে।
প্রথমতঃ পুলিশি তদন্ত প্রক্রিয়া-
ফরেনসিক দল এবং পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যার ঘটনা বলে সন্দেহ করা হলেও, কোনো সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে কি না বা নেপথ্যে নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছিল কিনা সে বিষয়ে রাজ্য সরকার বা পুলিশ প্রশাসনের তরফে এখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছুই নিশ্চিত করা হয়নি।
দ্বিতীয়তঃ মৃত্যুর নেপথ্যে কারণ –
উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদের দৈনন্দিন কর্মজীবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন মানসিক চাপ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু অনুরাগ ধ্যানকরের আত্মহত্যার পেছনে কি রাজনৈতিক বা কর্মক্ষেত্রের চাপ? নাকি নেপথ্যে কোনো ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা মানসিক অবসাদ ছিল? তা ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণের পরই পরিষ্কার হবে।
তৃতীয়তঃ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ভরসা –
মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা নিজে হাসপাতালে গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন এবং গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, আইন অনুযায়ী যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঠিক কারণ প্রকাশ করা হবে।
বিরোধী দলগুলো এই মৃত্যুকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও “রাজনৈতিক চাপের” ফল হিসেবে চিহ্নিত করে আন্দোলন জোরদার করছে। অন্যদিকে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়—তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ফরেনসিক রিপোর্টের তথ্য সামনে আসলেই স্পষ্ট হবে যে এই মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো বাহ্যিক চাপ ছিল, নাকি ব্যক্তিগত কোনো কারণ।

