রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— বামেদের চিরাচরিত ভোটব্যাংক শুধু মথা নয়, শাসক দল বিজেপির দিকেও স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে আদিবাসী যুবসমাজের একাংশ যারা বামেদের নতুন স্লোগানে আকৃষ্ট হয়েছিল, তারাও শেষ পর্যন্ত ইভিএমে আস্থা দেখাতে পারেনি।

ডেস্ক রিপোর্টার ,২৪ মে।।
       সদ্য সমাপ্ত এডিসি নির্বাচনে অভাবনীয় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে বামফ্রন্ট। বামেদের উপজাতি রাজনীতির একসময়ের একচেটিয়া দুর্গ ছিল পাহাড়। কিন্তু পাহাড়ে টানা দ্বিতীয় বার ধসে গিয়েছে বামেরা। ২১- র মতো ২৬শেও  খাতা খুলতে ব্যর্থ লাল শিবির। অথচ এই নির্বাচনেই একঝাঁক ‘তরুণ মুখ’ সামনে এনে ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করেছিল সিপিআই(এম) তথা বাম নেতৃত্ব।
     এডিসি নির্বাচনে বামেদের ঝুলি শূন্য হলেও সামনেই কড়া নাড়ছে এডিসি ভিলেজ কমিটি নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে পাহাড়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং দলের তরুণ তুর্কিদের ধরে রাখাই এখন বাম নেতৃত্বর কাছে সবচেয়ে অ্যাসিড টেস্ট।


“প্রদ্যোত কিশোরের তিপ্রামথার গায়ে আসলে ‘লাল মথা’র সংক্রমণ ঘটেছে।”

এডিসি নির্বাচনী প্রচারের সময় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব জোরালো কটাক্ষ করে বলেছিল, “প্রদ্যোত কিশোরের তিপ্রামথার গায়ে আসলে ‘লাল মথা’র সংক্রমণ ঘটেছে। অর্থাৎ, বামেদের ভোটব্যাংক ও ক্যাডার বাহিনী তলে তলে মথার দিকে ঝুঁকেছে।”
       তবে ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর সেই কটাক্ষ আংশিক হলেও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ২৬ শতাংশের বেশি ভোট শেয়ার ধরে রেখে তিপ্রামথা যেখানে ২৪টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, সেখানে বামফ্রন্ট ১০ শতাংশ ভোটের গণ্ডিও পার করতে পারেনি। অথচ ২১- র এডিসি নির্বাচনে বামেদের দখলে ছিলো মোট  ভোটের ১২শতাংশ।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— বামেদের চিরাচরিত ভোটব্যাংক শুধু মথা নয়, শাসক দল বিজেপির দিকেও স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে আদিবাসী যুবসমাজের একাংশ যারা বামেদের নতুন স্লোগানে আকৃষ্ট হয়েছিল, তারাও শেষ পর্যন্ত ইভিএমে আস্থা দেখাতে পারেনি।পাহাড় রাজনীতিতে প্রদ্যুতের ফ্লেভারের কাছে , বামেরা কি ধরে রাখতে পারবে সদ্য লাইম লাইটে  আনা তরুণ মুখদের?

উপজাতি যুবকদের একাংশকে বামপন্থার দিকে টানতে জীতেন্দ্র চৌধুরী, মানিক দে-রা তৈরি করেছিলেন তরুণ ব্রিগেড। দলের টানা পরাজয়ের পর তরুণদের মধ্যে চরম হতাশার  বাসা বেঁধেছে। আর হওয়াও স্বাভাবিক। বলছেন রাজনৈতিক প্রাজ্ঞরা।


উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বর্তমান রাজনৈতিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং টানা শূন্য আসনে থাকা দলে তরুণদের ধরে রাখা কঠিন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বর্তমান রাজনৈতিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং টানা শূন্য আসনে থাকা দলে তরুণদের ধরে রাখা কঠিন। শাসক দল বিজেপি বা শক্তিশালী আঞ্চলিক দল মথার তরফ থেকে এই তরুণ মুখদের টানার চেষ্টা হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা রাজনীতিরই পার্ট।


প্রশ্ন উঠছে,বামেদের এই ধারাবাহিক সাংগঠনিক রক্তক্ষরণ কি আদৌ বন্ধ হবে?

রাজনীতিকরা বলছেন,এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বামেদের আত্মবিশ্লেষণের গভীরতায়। পাহাড়ের রাজনীতি এখন আর শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা শ্রেণির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন জাতিগত আত্মপরিচয় ও আবেগের সমীকরণ।


পাহাড় পলিটিক্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে বামেদের খাতা খোলার বিষয়টি আকাশ – কুসুম চিন্তাভাবনার মতোই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের  অভিমত, যতক্ষণ না বামপন্থীরা পাহাড়ের মানুষের এই ‘Identity Politics’ বা আত্মপরিচয়ের আবেগকে নিজেদের মতাদর্শের সঙ্গে মেলাতে পারছে, ততক্ষণ কেবল ‘তরুণ মুখ’ এনে এই রক্তক্ষরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা কঠিন। তবে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে যদি তারা অন্তত কিছু আসনে সম্মানজনক ফল করতে পারে এবং ভোট শতাংশ বাড়াতে পারে, তবেই বলা যাবে যে রক্তক্ষরণের গতি কিছুটা হলেও থমকেছে। অন্যথায়, ত্রিপুরার পাহাড়ে বামেদের পুনরুত্থান আরও সুদূর পরাহত হয়ে পড়বে। এটাও বলে রাখা ভালো পাহাড় পলিটিক্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে বামেদের খাতা খোলার বিষয়টি আকাশ – কুসুম চিন্তাভাবনার মতোই।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *